টিংকুর হূদয়ে মলিনতা ছিল না, এটাই অহংকার

প্রকাশিত: 12:16 PM, February 8, 2016

টিংকুর হূদয়ে মলিনতা ছিল না, এটাই অহংকার

খুজিস্তা নূর ই নাহারীন মুন্নী :

ও’ চলে গেছে প্রায় চার বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আমি কখনো ওর কবরে যেতে চাইনি। আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি সুনসান কবরের নিস্তব্ধতায় শুয়ে আছে। আমি এ সহজ সত্যটি মেনে নিতে পারি না আজ অব্দিও। ওর কষ্টমাখা মুখ, অসহায়ত্ব এখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে চোখে ভাসে। একজন তরতাজা মানুষ হঠাত্ জানতে পারল, ওর ডাক এসেছে, ওকে এ মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। মুহূর্তের মধ্যে সব সুন্দর স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হলো। সামনে তাকাতে পারি না, কোনো কিছু ভাবতে পারি না কেবলই অমাবস্যা, কেবলই অন্ধকার। একটা সময় পর সত্যের মুখোমুখি হই। ওকে বলি, ‘হাতে যে কটা দিন সময় আছে মৃত্যুর কথা নয়, মন খারাপ নয়, চলো আমরা বাঁচার চেষ্টা করি’। আনন্দ ফুর্তিতে সময় কাটানোর চেষ্টা করি। বলা যত সহজ করা ঠিক ততটাই কঠিন। একজনের আড়ালে অপরের চোখের পানিতে বালিশ ভেজানো। ভিতরে যত কষ্টই হোক, বুক ফেটে চোখ থেকে বেদনারা বেরিয়ে আসতে চায় হাসি মুখে বলে চলা, ‘ভালো আছি’। ডাক্তার প্রথমেই বলে দিয়েছে, গ্ল্যইওব্লাস্তমা গ্রেড ৪, সবচেয়ে খারাপ ধরনের ব্রেইন ক্যান্সার, হাতে সময় খুব অল্প। বড়জোড় ১৫ মাস। সময় নিয়ে ভাবতে ভয় লাগে। রাতে ছেলের বুকে শুয়ে হঠাত্ চিত্কার করে কেঁদে উঠি। আমার বাচ্চা দুটো ভয়ে বুকের মধ্যে সিটকে থাকে। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা রেখে, আমায় একা ফেলে লোকটা অকালে চলে যাবে! বুকের ভিতরটা মোচড় দেয়, গলা বেয়ে কি একটা দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কিচ্ছু বলি না, অসহায় তাকিয়ে থাকি আর ভাবি কী করে কাটাব আমি ওকে ছাড়া! ইন্ডিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকা ঘুরে কোথাও ওষুধ মিলল না, চিকিৎসা হলো কিন্তু কাজে এলো না। মৃত্যুর মাস তিনেক আগে থেকে হাত পা প্যারালাইজড হয়ে ও’ প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গেল। একজন প্রাণবন্ত মানুষের পক্ষে এ অবস্থা মেনে নেওয়া ভীষণ কষ্টকর। আর আমি! আমার আদরের ধন ধুলায় লুটায়। কী যে কষ্ট মানসিক অসহায়ত্ব বলে বোঝাবার নয়। একটা সময় পর মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হতে শুরু হলো ওর। ওর বন্ধু ডাক্তার পপসি ভাই আমায় বলল, ‘মুন্নি, বুঝই তো কেমো কোনো কাজে আসছে না, তবে আর যন্ত্রণা বাড়িয়ে লাভ কী’? আমার স্বামীর মৃত্যু পরোয়ানা আমার নিজের জারি করতে হচ্ছে। আমি ভিতরে ভিতরে মুষড়ে পড়লাম ক্ষয়ে ভেঙে যেতে থাকলাম, জোরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হলো কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ধীরস্থির শান্ত কণ্ঠে বললাম, এ মুহূর্তে ওর জন্য যেটা ভালো হয়, তাই করুন। ল্যাবএইড থেকে বাসায় ফিরে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আমার বৃদ্ধ অসহায় মায়ের সঙ্গে মিছেই চরম দুর্ব্যবহার করে ফেললাম। যা কখনো করি না, জিনিসপত্র ভাঙতে থাকলাম, মায়ের সঙ্গে চিত্কার চেঁচামেচি করা শুরু করলাম। পুরোটাই নিজের অসহায়ত্ব আর বেদনাকে আড়াল করার জন্য মনের অগোচরে করা। কিন্তু মায়ের কাছে সরি বলতে পারলাম না, একবারও বলতে পারলাম না আমার চরম দুর্দশার করুণ ইতিহাস।

ওর হাত পা শরীর সব প্যারালাইজড, নাক দিয়ে কেবল নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি ওর কপালে গভীর মমতায় হাত রাখলাম, সঙ্গে সঙ্গে ও নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিল। যেন হাতের স্পর্শটা পরিপূর্ণভাবে অনুভব করতে চাইল। এটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ যোগাযোগ। আমার ভিতরটা সেদিন ডুকরে কেঁদে উঠল। একজন মৃত্যুপথযাত্রী অসহায় মানুষ যার শরীরটা পুরোপুরি নিস্তেজ, নিষ্ক্রিয় কিন্তু এখনো পরিপূর্ণ জ্ঞান আছে। ওর কষ্ট অসহায়ত্ব আমার সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে। সারা দেশে যেখানে যে আছে ফোন করে বললাম ওর জন্য দোয়া পড়াও, মিলাদ পড়াও। এতদিনে সবাই প্রায় জেনে গেছে ওর বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার বড় ভাই অসহায় কণ্ঠে আমায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কী দোয়া করাব’? আমি শান্ত স্বরে কেবল বলতে পারলাম, ‘আল্লাহ যেন আমাদের মাফ করে দেন আর ওর কষ্ট কমিয়ে দেন’। পরদিন ৮ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টায় সত্যি সত্যি আল্লাহপাক ওর কষ্ট কমিয়ে দিয়ে আপন করে নিল। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পথে বিড়বিড়িয়ে নিজেকেই যেন বললাম ১৫ মাসের ২ দিন আগেই চলে গেল! ডাক্তার তো বলেই ছিল বড়জোর ১৫ মাস। সঙ্গে সঙ্গে আমার বাচ্চা দুটো কথা কয়ে উঠল, ‘আগে আমাদের বলনি কেন’। যেন আমি ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি ওদের সঙ্গে। আমি কী করে ওদের বুঝাই, কথাটি বলা এত সহজ ছিল না আমার জন্য। প্রতিবার ডাক্তারের কাছে ও’ ভীষণ আশা নিয়ে জিজ্ঞাসা করত, ‘আমার কতটা সময় হাতে আছে’? ডাক্তার নিষ্ঠুরের মতো উত্তর করত, ‘৮ থেকে ১৫ মাস’। কেউ যখন জিজ্ঞাসা করত ডাক্তার কী বলেছে, আমার ভীষণ নিষ্ঠুর মনে হতো তাদের। আমি ওকে কোনো কথা বলতে দিতাম না, নিজেই তাড়াতাড়ি উত্তর দিতাম, ‘ডাক্তার বলেছে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে’। ওর মৃত্যুর পর সবাই চিত্কার করে কাঁদছে। কেবল আমি কাঁদছি না। আমি মহান আল্লাহপাকের শোকর গুজার করে শেষ করতে পারি না, ‘মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ওকে কষ্ট থেকে রেহাই দিয়েছে’। আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। ওর পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই সেজেগুজে আসছে আর আমার কান্না না দেখে হতাশ হয়ে বলছে, ‘তুমি অনেক শক্ত আছ’। আশ্চর্য ওরা কি দেখে আমার সমালোচনা করছে! ওরা কি অন্তর্যামী! ওরা কী করে জানবে আমার ভিতরের কষ্ট, হতাশা, অসহায়ত্ব, হূদয়ের গহিনে ভাঙচুরের কথা। সবার প্রকাশভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা, ধারণ ক্ষমতা এক হবে কী করে। অনুভূতিগুলো মানুষের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা, রুচিবোধ, ম্যাচিউরিটি আর অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। তবে ভালো-খারাপ বিচারের অধিকার ওরা কোথায় পেল? টিংকুহীন চারটি বছর একেবারে কম নয়। এ সময়টুকুর মধ্যে কত কী যে দেখলাম কত কী যে শিখলাম। মৃত্যুর আগে ও’ আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য সাহস দেওয়ার জন্য অনেক সময় বলত, ‘আমার পুত্রতুল্য ভাইকে তোমাদের পাশে পাবে, বিগত ৩০ বছর ধরে ওকে নিজের ছেলের চেয়েও বেশি আদর দিয়েছি স্নেহ দিয়েছি, বিপদের দিনে অমুক অমুক ভাই তোমার পাশে থাকবে’। হায়রে ভাই, হায়রে পুত্র! সবাইকে দেখেছি। সারা জীবনে যাদের চিনতে পারিনি, কষ্ট পেলেও তাদের রূপ আমার সামনে আজ উন্মোচিত। স্বার্থের জন্য স্ব স্ব মূর্তিতে তাদের উপস্থিতি আমায় জানান দিয়েছে, ‘জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন’। কষ্ট আছে, বেদনা আছে কিন্তু পাশে শান্তি আছে, আত্ম প্রসাদটুকুন আছে, ‘আমি অনেক হূদয়বান একজন মানুষকে ভালোবেসেছিলাম’। যে কোনোদিন নিজের স্বার্থের কথা ভাবেনি, নিজের স্ত্রী এমনকি সন্তানদের কথাও ভাবেনি, তার চারপাশের মানুষদের সুখী করতে সদা সচেষ্ট থেকেছে। মানুষের প্রতি নিজের অঙ্গীকার, কর্তব্য, দায়িত্ববোধ থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি। মৃত্যু দুয়ারে দাঁড়িয়ে জেনেও নিজের সন্তান নয়, পুত্রতুল্য ভাই এবং অন্যদের স্বার্থ রক্ষায় সদা সচেষ্ট থেকেছে। পুত্রতুল্য ভাই, এতিমখানায় বড় হওয়া ছেলেটি যাকে ছাত্ররাজনীতি থেকে আগলে চাকরি দিল, পরে নিজের সঙ্গে রেখে ব্যবসায় সমান অংশীদার বানাল। এক-এগারোর পরে সে কানাডার নিরাপদ জীবনে চলে গেল। আর টিংকুর কাঁধে ফেলে গেল সব ঋণের বোঝা। টিংকুর মৃত্যুর পর আমার বিশ্বাস আর সরলতাকে পুঁজি করে নিজের আখের গোছানোর পর সব সম্পর্ক মুছে ফেলল নিমিষেই। আমাদের বিয়ের মাত্র তিন মাস পরে ছেলেটির বিয়ে হয়। গহনা কেনার টাকা টিংকু কোথায় পাবে! টিংকুর ভালোবাসার আতিশয্যে আমি স্নেহে আপ্লুত হয়ে নিজের সব গহনা উপহার হিসেবে দিয়ে দিলাম। অথচ বিদেশ বিভূঁইয়ে একই শহরে থাকলেও সেই ভাই টিংকুর ছেলের বিন্দুমাত্র খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করে না কখনো। অনেকবার ওর সঙ্গে বসতে চাইলেও বসেনি, ফোন করলেও ধরেনি। আর টিংকু অন্য যেসব ভাইদের কথা বলত যাদের ওপর নির্ভর করত তারাও লাশ দাফনের পর আর খবর নেই। টিংকু বেঁচে থাকতে যারা তাকে ঘিরে ফায়দা নিয়েছে তারাই তার সন্তানদের ঠকিয়েছে। কিন্তু মনে শক্তি আছে, মনটা ভরে যায় দেশ-বিদেশের অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব আপনজন যখন খোঁজ নেয়, তাকে স্মরণ করে। একবাক্যে বলে, ‘তার আত্মাটা বড় ছিল’। তখন সন্তানদের সঙ্গে আমারও কষ্ট লাঘব হয়। টিংকু বিশ্বাস করত, ‘সে শুধু পরিবারের নয়, মানুষের’। মানুষই তাকে মূল্যায়ন করছে, তাকে ভুলেনি। ভুলেছে কেবল নষ্ট, স্বার্থপর যারা তার ওপর ভর করে অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়েছে, তাকে উপরে উঠার সিঁড়ি বানিয়েছে। রাজনৈতিক সহকর্মী, চট্টগ্রামের মানুষ ছিল ওর আত্মার আত্মীয়। চট্টগ্রাম ছিল ওর প্রাণ, পড়ে থাকত ওখানেই বেশি। বিশ্বাস করত রক্তের সম্পর্কই শেষ নয় আত্মার সম্পর্ক অবিনাশী। পরিবারকে দেখত সামর্থ্যের বাইরে। আজ দেখা যায় চট্টগ্রামবাসীই তার সন্তানদের খোঁজ নেয়। নেয় না শুধু যারা দুহাতে তাকে লুটেছে তারা। স্বার্থান্বেষী লোভী মানুষরা ওর সন্তানদের ঠকাচ্ছে ঠকাক। আমি মানুষ নয়, সৃষ্টিকর্তার শক্তিতে বিশ্বাসী, তার বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার ইচ্ছায় আস্থাশীল। জীবনে জেনেছি মানুষের হাতে কিছুই নেই। অসত্ মানুষরা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে সাময়িক কষ্টের কারণ হতে পারে কিন্তু তার সন্তানদের হূদয়ের সুখ-শান্তি, মান-সম্মান, চিন্তা-চেতনা, জীবনবোধ কী করে কেড়ে নেবে? এসবই তো আল্লাহর দান, তার অসীম দয়া, তার পরম রহমত। আমি জানি টিংকুর হূদয়ে বিন্দুমাত্রও মালিন্য ছিল না, স্বার্থপরতা ছিল না, অসততা ছিল না, চিন্তাধারায় কোনো নীচতা ছিল না। টিংকুহীন জীবনে এটাই আমার বড় সুখ, আনন্দ, একমাত্র পাওয়া, আমার অহংকার।

লেখক : সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু’র স্ত্রী

[the_ad id=”312″]

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 25 বার পঠিত হয়েছে