এক ক্ষণজন্মার সাথে বসবাস– খন্দকার মুদাচ্ছির আলী

প্রকাশিত: 12:19 AM, August 5, 2021

প্রতিটি মানুষ তার আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা ও কর্মে অন্য মানুষের থেকে আলাদা। কিন্তু স্রষ্টা কাউকে কাউকে বিশেষ গুণাবলী ও দক্ষতা দিয়ে সৃষ্টি করেন; যার ফলে তার উপস্থিতি পরিবার ও সমাজে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। আমি তেমনি এক ক্ষণজন্মার কথা বলছি। বলছি-পরিবার, সমাজ ও সর্বোপরি গণমানুষের জন্য অপরিসীম ভালবাসা বুকে নিয়ে জীবনের শেষদিন পযর্ন্ত নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া ‘ভাষা রেহনুমা’র গল্প।
তোমার আমার জীবনের গল্প যখন একই সুঁতোয় বাধা পড়ে তখনও বুঝতে পারিনি তোমার আমার সম্পর্কের শেকড় এত গভীরে প্রথীত হবে। তোমার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সহপাঠী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যাযীগণ হয়ত জানেনা- দিনের পর দিন সারাবেলা না খেয়ে আমার সাথে খাওয়ার জন্য তোমার অপেক্ষার গল্প। আজ মনে পড়ছে আমি অফিসে যাওয়ার সময় তুমি যদি ঘুমিয়ে থাকতে, তাহলে ঘুম থেকে ওঠার পর নাস্তা না খেয়ে, দুপুরের খাবার না খেয়ে আমার আসার প্রতীক্ষায় থাকতে। তোমার বেশী খিদে লাগলে আমাকে বার বার ফোন দিতে। আমার যত দেরি হোক না কেন একদিনের জন্য ও তুমি খেতে না। আমি এ নিয়ে প্রায়ই রাগ করতাম। কিন্তু আমাকে ফেলে তুমি খাবে না এ যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। কোন পারিবারিক, সামাজিক, প্রফেশনাল, এমনকি তোমার বন্ধুদের প্রোগ্রামে গেলেও আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোমার ব্যাকুলতা তখন না বুঝলেও আজ বুঝি স্রষ্টা এত ছোট জীবন দিয়েছিল বলেই হয়ত এক মুহুর্ত চোখের আড়াল করতে চাইতে না। আমার সরকারি চাকুরীর সীমিত আয়ের কিভাবে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ব্যবহার করা যায় তা তুমি দেখিয়ে গেছ। আমার সুস্থতা, আর্থিক ও কর্মক্ষেত্রের উন্নতির জন্য তোমার ঐকান্তিক চেষ্টা আমাকে তোমার উপর শতভাগ নির্ভর করে তুলেছিল। আমার দুইবার হজ্বে যাওয়া; আমার মা, বাবা, তুমি এবং আমি এক সাথে হজ্ব করার উদ্যোগ ও এর সফল বাস্তবায়ন তোমারই একক কৃতিত্ব। আমি ইংল্যান্ডে মাস্টার্স পড়তে যাওয়া-আসা, সেখানে এক বছর অবস্থান, পুনরায় দেশে এসে বাসা গুছানো ও সিলেটে বাসা স্থানান্তর-সবকিছু এক হাতে ও এক মাথা দিয়ে এতো নিপুনভাবে করেছ যে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ইংল্যান্ডে থাকা অবস্থায় যখন আমার আব্বুর মৃত্যুর সংবাদ পাই তখন আমাদের পাসপোর্ট কানাডা এম্বেসিতে। এম্বেসিতে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায় কম হলেও ৫ দিন সময় লাগবে পাসপোর্ট ফেরত পেতে। তোমার একক প্রচেষ্টায় কয়েক ঘন্টার মধ্যে পাসপোর্ট তুলে আমার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছিলে। সম্পূর্ণ একা একা প্রায় একমাস ধরে সব গুছিয়ে দেশে ফিরেছিলে। ফিরে এসে আবার নতুন করে সংসার গুছানো কিভাবে পারতে এত কিছু। আমার স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামকে তুমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে। যে কোন শুভ কাজ করতে আমাকে সাথে রাখতে। আজ আমাদের প্রায় ৭ বছরের যুগলবন্ধী সময়ে ফিরে তাকালে নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমার প্রতি তোমার ভালবাসার কানাকড়ি ঘাটতি ছিলনা। যতদিন গিয়েছে বন্ধন তত দৃঢ় হয়েছে। আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাফল্যে তোমার মনভরে উঠত, খুশিতে সবাইকে বলে বেড়াতে। এতো আস্থা, এত ভালবাসা, এত নির্ভরতা, এক নিমিষে হারিয়ে-যাওয়া এটাই কি জীবন। তোমাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আজ। তোমাকে নিয়ে লিখতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তারপরও লিখছি এবং লিখব। কারণ আমার প্রতি তোমার বড় অভিযোগ ছিল তোমাকে নিয়ে আমি কিছু লিখি না। এ অভিযোগের দায় নিয়েই আজ লিখছি। জানিনা তুমি দেখছ কিনা! ওপার থেকে এপার দেখা যায়! কই এপার থেকে তো আমি ওপারের খবর পাই না।
মাতৃত্ব ও অনাগত সন্তানকে ঘিরে তোমার একবুক স্বপ্ন নিয়ে চলে গেলে ওপারে। আমার একটাই স্বান্তনা যে, তুমি ওপারে একা নও। তোমার সাথে ঘুমিয়ে আছে তোমার বাবা, কন্যা ও নানা।
আমার বৈবাহিক জীবনে তোমার মুখ থেকে যে দুটি শব্দ অনেক বেশি শুনেছি তা হল ‘সুনামগঞ্জ’ আর ‘বাবা’। তাইতো আজ সুনামগঞ্জে বাবার কোলেই তুমি তোমার অনাগত কন্যাসহ ঘুমিয়ে আছ। সুনামগঞ্জ, সুনামগঞ্জের মানুষ, আলো, বাতাসকে তুমি তোমার বাবার মত ভালবাসতে। সুনামগঞ্জের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে সহায়তার চেষ্টা করতে। তোমার প্রতিষ্ঠিত সুনামগঞ্জ শিক্ষা কল্যাণ ফোরামের মাধ্যমে নিজের অর্থায়নে অনেক ছাত্রকে বৃত্তি দিয়েছিলে। করোনার প্রকোপ কমলে আরও দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলে। গত বছর এপ্রিলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরুর প্রাক্কালে তুমি ডাক্তারদের একটি প্যানেল তৈরী করে দিয়েছিলে যাতে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পায়। তোমার প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জবপুপষব ইরহ এৎবধঃবৎ ঝুষযবঃ উরারংরড়হ এর মাধ্যমে দুঃস্থদের জন্য খাদ্য ও কাপড় সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলে। আমি ভেবে অবাক হই তোমার কাপড় চোপর, অলংকার ও অন্যান্য জিনিস এত গুছিয়ে রেখেছ যে, এক মিনিট ও লাগেনি কিছু খুজে পেতে। আইসিইউ থেকে গলার চেইন খুলে কাজের মেয়েকে দিতে বলা, ব্যাগের টাকা ও মোবাইল আম্মাকে দিতে বলা-এযেন সব গুছিয়ে বিদায় নেয়া। হাসপাতালে বসে আম্মা ও আম্মু’র করোনা টেষ্ট করানোর ব্যবস্থা করেছিলে। কিভাবে অন্যের এত ভাল চাওয়া সম্ভব আজও বুঝি না। তোমার সাথে আইসিইউ’র ভেতরে সারাক্ষণ আমি ও তোমার বোন কথা ছিল। বাসায় আম্মু ও আম্মা তোমার সংস্পর্শে ছিল কারো তো করোনা হলো না। এমনকি তোমাকে তোমার বাবার কোলে রেখে আসার পর তোমার সংস্পর্শে আসা ও বাড়িতে অবস্থান করা ৩২ জনকে করোনা টেষ্ট করা হলে সবার রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। এ এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেল? শতভাগ কোয়ারেন্টাইনে থাকা, অন্ত:সত্ত্বার কারণে টিকা নিতে না পারা, অ্যাজমা, করোনা সংক্রমণ, ও দ্রুত শারীরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া—কোন উত্তর খুজে পাই না; জানি কখনও পাবও না। জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের মত স্রষ্টার কাছে আমারও প্রশ্ন- মানবজীবন এত ছোট কেন? তুমি তো সবার ভাল চাইতে, তাহলে পৃথিবীতে কি ভাল মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে? উত্তরহীন আরো বহু প্রশ্ন জন্ম দিয়ে তুমি চলে গেলে।
আমাদের জীবনের গল্প কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ী ছোট গল্প হয়ে রইল- শেষ হয়েও হইলনা শেষ, রেখে গেলে বিশাল প্রশ্ন সম্ভার যার উত্তর জীবনভর খুঁজেও সমাধান হবে না।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 61 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ