গোলাম রব্বানী একজন সংগ্রামী জননেতা —-মুহিবুর রহমান মানিক

প্রকাশিত: 12:14 AM, August 5, 2021

প্রয়াত গোলাম রব্বানী ছিলেন সুনাগঞ্জের প্রগতিশীল রাজনীতির এক অপরিহার্য নাম। স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা, পরবর্তীতে সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামে রব্বানী ভাইর অবদান ইতিহাস স্বীকৃত। চির তারুন্যের প্রতিক রব্বানী ভাই ছিলেন একজন আজীবন সংগ্রামী। ছাত্রজীবনের শুরুতেই হাইস্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। কর্মদক্ষতায় আর সাংগঠনিক তৎপরতায় সমগ্র সিলেট জেলায় তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে তিনি বিপুল ভোটে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। পরে কলেজ শাখা ও মহকুমা শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।
সুনামগঞ্জের সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আস্থাভাজন। কর্মঠ ও পরিশ্রমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে অচিরেই হয়ে উঠেন সকলের প্রিয়ভাজন হিসেবে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলিতে তাঁর তৎপরতা ছিল অতুলনীয়।সুনামগঞ্জে সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠনসহ স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি লগ্নে তিনি পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। তিনি শুধু মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠন নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা।মুক্তিযোদ্ধাদের প্রিয়মুখ হিসেবে হয়ে উঠেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র।
রব্বানি ভাই আমৃত্যু আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে গণমানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ইউনিট কমান্ডের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ-এর সহ-সভাপতি। দ্বন্ধমুখর রাজনীতির দ্বিধাবিভক্তিতেও তিনি সত্য উচ্চারণে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। দল ক্ষমতায় থাকলেও দলের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের ধার ধারতেন না। স্বভাবসুলভ আচরণে যেমন সকলকে মাতিয়ে রাখতেন তেমনি নেতাদের অন্যায় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। প্রশাসনের অন্যায় ও অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে ছিলেন একজন সোচ্চার কন্ঠ। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন সমাজকর্মী। যেকোনো মানুষ যেকোনো সমস্যা নিয়ে হাজির হলে তার কথা শুনতেন। সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন সমাধানের জন্য। রব্বানী ভাই ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন গণমানুষের নেতা। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। ছিলেন একজন হৃদয়বান মানুষ। রাজনৈতিক কুঠিলতাকে প্রশ্রয না দিয়ে সংগঠনের কাজে নিবেদিত থাকতেন। অসঙ্গতির প্রতিবাদ করতেন। আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। বিপদে আপদে সবসময়ই তাঁকে পাশে পেয়েছি। আমি যখন মিথ্যা মামলায় কাশিমপুর কারাগারে তখন তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। কত কথা, কত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কর্মীদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ। যার প্রমাণ বারে বারে আমি পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই আপাদমস্তক রাজনীতিবিদকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি। রব্বানী ভাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। ছিলেন একজন সাহসী সাংবাদিক। সুনামগঞ্জ থেকে দুদুটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সাপ্তাহিক গ্রাম বাংলার কথা, সাপ্তাহিক বিন্দু বিন্দু রক্তে পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন তিনি। সংবাদ প্রকাশের জন্য অনেকের চক্ষুশূল হতে হয়েছিল তাঁকে। প্রশাসনের বিরাগভাজনও হয়েছেন অনেকবার।
বহুমাত্রিক রব্বানী ভাই ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। জেলা সমবায় ইউনিয়ন-এর সভাপতি, সিলেট বিভাগ বাস্তবায়ন কমিটির জেলা আহ্বায়ক, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রথম কার্যকরী কমিটির সভাপতিসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক পেশাজীবী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনেও পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা।

প্রয়াত জননেতা গোলাম রব্বানী প্রকৃত অর্থে একজন সংগ্রামী পুরুষ। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী গোলাম রব্বানী ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানী গণবিরোধী প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের ফটো সুনামগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্টে ভাঙ্গা ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে দীর্ঘ দুই মাস কারাবরণ করেছিলেন। ১৯৬২ সালে মজিদ খাঁন শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আবারও দেড় মাস কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে ছাত্র সমাজের ১১ দফা ও আয়ূব বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দেশমাতৃকার কঠিন সময়ে পালন করেন বীরত্বপূর্ন ভূমিকা। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সময়ও প্রায় দেড় মাস কারারুদ্ধ ছিলেন এই সংগ্রামী রাজনীতিবিদ। রাজনীতিকে পূঁজি করে অনেকেই বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন। কিন্তু রব্বানী ভাই ছিলেন লোভ লালসার উর্ধ্বে। তোষামোদি করা ছিল তাঁর চরিত্র বিরুদ্ধ। এজন্য অনেক নেতার পছন্দের তালিকায় ছিলেন না তিনি। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তিনি তাঁর নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে ধিক্ষীত করেছিলেন। তাঁ স্ত্রী ছাত্রজীবনে ছিলেন সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি, তিনি দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ মহিলা আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে এমপি হয়েছিলেন। একজন সৃজনশীল মানুষ রব্বানী ভাই ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। নিজ সন্তানদের নাম রেখেছিলেন বাংলা বর্ণের গভীর মমতায়। বড় মেয়ে ভাষা, ছোটো মেয়ে কথা। একমাত্র ছেলে স্মরণ। কি চমৎকার নামকরণ। কি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি। এসব থেকেই রব্বানী ভাইর বাংলা প্রীতি আর মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। খুবই দু:খজনক ঘটনা, রব্বানী ভাইর বড় মেয়ে ভাষা রেহনুমা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঝড়ে গেলো একটি তাজাপ্রাণ। বাবার মতো অসাধারণ সাংগঠনিক যোগ্যতা ছিল মেয়েটির। ঢাকাস্থ সুনামগঞ্জ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল। জেলা মহিলা আওয়ামী লীগেরও ছিল যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক । ২০১৮ সালের অসাধারণ দক্ষতায় জাতীয় নেতৃবৃন্দকে একত্রিত করে প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্মরণসভা আয়োজন করেছিল। বাবার মতো রাজনীতির প্রতি ছিল তার গভীর দরদ। বড় অসময়ে মেয়েটি চলে গেলো পরপারে। রব্বানী ভাইর প্রয়ানদিবসে ভাষার মৃত্যুর ঘটনা এবার আরো বেশি বেদনা নিয়ে এসছে। বর্তমান দুঃসময়ে রব্বানী ভাইর মতো একজন সাহসী পুরুষের বড়ো বেশি প্রয়োজন ছিল। সুনামগঞ্জের উন্নয়ন নিয়ে খন্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির যে অপরিনামদর্শী অপপ্রয়াস চলছে তার বিরুদ্ধে গোলাম রব্বানী নিশ্চয়ই হতেন সোচ্চারকন্ঠ। ২০০৬ সালের ৪ আগষ্ট আমি যখন বরিশাল কারাগারে তখন পত্রিকার মাধ্যমে প্রিয রব্বানী ভাইর মৃত্যুসংবাদ পাই। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে কি পরিমান কষ্ট পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি ছিলেন আমার অগ্রজতুল্য,একজন অভিভাবক। রব্বানী ভাইর ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। পরম করুনাময় আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। চিরশান্তিতে থাকুন প্রিয় রব্বানী ভাই। লেখক: মুহিবুর রহমান মানিক, জাতীয় সংসদ সদস্য, সুনামগঞ্জ ৫ (ছাতক-দোয়ারা বাজার)।

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 55 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ