করোনায় প্রাণ হারাচ্ছেন অন্ত:সত্তা মায়েরা তিন মাসে ঢাকা মেডিকেলেই মারা গেছেন ১২ জন

প্রকাশিত: 12:10 AM, August 5, 2021


অণলাইন ডেস্ক:
বিয়ের সাত বছর পর সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন কানিজ রেহনুমা রব্বানী ভাষা। এত বছর পর ঘরে নতুন সদস্য আসছে, তাই স্বভাবতই আনন্দে ভাসছিল পুরো পরিবার। এর মধ্যেই মৃত্যুর কালো মেঘ মলিন করে দিয়েছে পরিবারটির উৎসব। ভাষার মতো অনেক মা-ই গর্ভে সন্তান নিয়ে করোনায় মারা গেছেন। সংক্রমণ যত বাড়ছে, অন্তঃসত্ত্বাদের মৃত্যুও তত বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ৩৫ শতাংশই করোনা আক্রান্ত। গত তিন মাসে শুধু এই হাসপাতালেই মারা গেছেন এ রকম ১২ নারী।
নারীসমাজের উদাহরণ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল ভাষার। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই আইনজীবী বাবার পথ ধরে নিজেও নাম লিখিয়েছিলেন রাজনীতিতে। অল্প বয়সেই সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবহারে জয় করে নিয়েছিলেন মানুষের মন। থাকতেন সিলেটের তালতলায় শাশুড়ি লায়লা পারভীনের সঙ্গে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন বেশ কয়েক মাস। তবে প্রসব-পূর্ববর্তী গর্ভকালীন চেকআপ করাতে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পর ৩ জুলাই জ্বরে আক্রান্ত হন। নমুনা পরীক্ষা করালে করোনা শনাক্ত হয়।
জ্বরের মাত্রা বেড়ে গেলে ৭ জুলাই ভাষাকে ভর্তি করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে পরদিন স্থানান্তর করা হয় বেসরকারি মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে। খুব দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ১৪ জুলাই ফের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তার গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানও আর পৃথিবীর আলো দেখেনি।
ভাষার স্বামী বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মোদাচ্ছির বিন আলী বলেন, ‘সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান ভাষা। তার বাবা প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী এবং মা সাবেক সংসদ সদস্য শাহানা রব্বানী। ভাষার আম্মা সুনামগঞ্জ জজকোর্টের পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এত পরিচয়ের ভিড়েও খুব সাধারণ ছিল ভাষা। পেশাগত কাজের মাধ্যমে যে আয় করত, তার বেশিরভাগ অর্থই সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করত। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাষা মা হতে চেয়েছিল। সেই আশা অপূর্ণ থেকে গেল।’
ভাষার ছোট বোন কানিজ রহিমা রব্বানী পেশায় চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘গর্ভকালীন আমার বোন পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। করোনা আক্রান্ত হলে হাসপাতালে তাকে কোনো গাইনি সাপোর্ট দেওয়া হয়নি।’
রাজধানীতে সরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন ৩০ বছরের সাবরিন জাহান। স্বামী বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা জুলাই মাসের শুরুতে মিরপুরের এক ল্যাবে গিয়েছিলেন গর্ভকালীন কিছু চেকআপ করাতে। বাড়িতে ফেরার পর জ্বরে আক্রান্ত হন। নমুনা পরীক্ষা শেষে ৯ জুলাই ফলাফল আসে তিনি ‘করোনা পজিটিভ’। ১৪ তারিখে তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। ২৪ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই মারা যান সাবরিন।
ভাষা, সাবরিনের পরপরই জুলাই মাসের শেষ দিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ঝালকাঠির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সানিয়া আক্তার (২৯)। তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত ১২ জুলাই ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে র‌্যাপিড টেস্ট করালে তার করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ২২ জুলাই ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম রিমি মারা যান। ঈদের আগের দিন ২০ জুলাই মারা যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক হালিমা আকন্দ। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হওয়ায় তার জটিলতা দেখা দেয়। ১৫ জুলাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নবনীতা সরকার (২৬) নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে এক শিশুকন্যার জন্ম দেওয়ার পর মারা গেছেন বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তরের সহযোগী প্রযোজক রিফাত সুলতানা (৩৩)। তিনিও করোনা আক্রান্ত ছিলেন।
প্রতিদিন করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যুর সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্তঃসত্ত্বা নারীকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না। যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অন্তঃসত্ত্বাদের টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হতো, তাহলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা কমে যেত।
টিকাবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য প্রসূতিবিদ্যার অন্যতম চিকিৎসক অধ্যাপক মালিহা রশীদ বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি নারীদের কভিড-১৯ সংক্রমণ এবং এর ফলে মারাত্মক অসুস্থতার ঝুঁকি অনেক বেশি। মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের টিকা দেওয়া দরকার।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল সমকালকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় গত বছরের মার্চে। ওই বছরের তুলনায় চলতি বছর অন্তঃসত্ত্বাদের করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ। বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বাদের বেশিরভাগই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। এই ভ্যারিয়েন্ট অত্যধিক সংক্রামক। অন্তঃসত্ত্বাদের এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ হলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। এতে গর্ভের সন্তানের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। এ ছাড়া গর্ভপাত এবং অপরিণত শিশু জন্মদানের হারও বেশি।’
অন্তঃসত্ত্বাদের করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য তাদের চারপাশে একটা সুরক্ষাবলয় তৈরি করার আহ্বান জানিয়ে এই গাইনি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পরিবার থেকে সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে হবে। পরিবারে সব সদস্যকে বাইরে থেকে এসে যেন অন্তঃসত্ত্বার সংস্পর্শে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের খাওয়ার ও ব্যবহারের জিনিসপত্র আলাদা করতে হবে। যেসব অন্তঃসত্ত্বা চাকরিজীবী, তাদের ক্ষেত্রে কর্মস্থল থেকে ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। অথবা তারা যেন বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে।’
৩৫ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা :করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বার অন্যতম চিকিৎসাপ্রাপ্তির স্থান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক সমকালকে জানান, এখানে ভর্তি হওয়া অন্তঃসত্ত্বা নারীর ৩৫ শতাংশই করোনা আক্রান্ত। তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেশি।
গত তিন মাসের (মে-জুলাই) চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার সময় অনেক রোগীকে সিসিইউ এবং আইসিইউতে নিয়েও সফল হওয়া যায়নি। গত তিন মাসে এ হাসপাতালে ১২৮ জন করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারী চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১২ জন। তিনি বলেন, করোনার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃ ও শিশুমৃত্যু বেড়েছে।
টিকা নিতে পারবেন অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মা :গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা নেওয়ায় কোনো সমস্যা হয় না, বরং ঝুঁকি কমে। যে মা শিশুকে দুধ খাওয়ান, তিনি টিকা নিলে শিশুর করোনা ঝুঁকি কমে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৫ হাজার ও ইংল্যান্ডে ২৫ হাজার অন্তঃসত্ত্বাকে করোনা প্রতিরোধক টিকা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রসূতিবিদদের বিভিন্ন সংগঠন অনলাইনে এক বৈঠক করে। এতে অবসটেকট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, বর্তমানে অধিকসংখ্যক অন্তঃসত্ত্বা মা প্রসবকালে বা তার আগে-পরে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই মা ও শিশুর সুরক্ষায় টিকাদানের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশে এখনও কেন মা ও শিশুর সুরক্ষায় টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে না?
সংগঠনটির আরেক সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামীনা চৌধুরী বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দুই থেকে তিন গুণ বেশি। মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। যেহেতু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এতে সেইসব নারীর স্বল্পমেয়াদি কোনো প্রভাব পড়তেও দেখা যায়নি। তাই বাংলাদেশেও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম স্থবির :করোনার ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বাড়ার ফলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা চলাকালে জন্মনিয়ন্ত্রণের হার কমে যাওয়ায় অন্তঃসত্ত্বাদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘদিনের বন্ধ্যত্ব না থাকলে নতুন দম্পতি কিংবা অন্যদের ক্ষেত্রেও করোনাকালীন পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এখন সন্তান না নেওয়ার প্রতি আহ্বান জানান মেরি স্টোপসের অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার মনজুন নাহার। তথ্যসুত্র: সমকাল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 47 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ