একটি তারকার বিদায়।

প্রকাশিত: 8:37 PM, June 24, 2020

BeautyPlus_20200624202741593_saveমিজানুর রহমান মিজান: সুনামগঞ্জের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জল তারকা মহসিনুর রহমান খানের অকাল প্রয়ানে শহরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ক্রীড়াঙ্গন – সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করছেন। অনেকেই মহসিন খানের এই চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছেন না। উজ্জল-উচ্ছল প্রানবন্ত একজন সদালাপী মানুষ হঠাৎ করে সামান্য সময়ের ব্যবধানে সবাইকে ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন! নিয়তির বিধান মেনে নিতেই হয়। প্রয়াত মহসিন খানের ঘনিষ্ট বন্ধু সুনামগঞ্জের শিক্ষা – সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আরেক উজ্জল নক্ষত্র সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক ও পৌরকলেজের মাননীয় অধ্যক্ষ শেরগুল আহমদের স্মৃতিচারন মুলক লিখনীটি পাঠকের সুবিধার্থে হুবুহু তুলে ধরা হলো :-

বিদায় এক উজ্জল তারকার
————————————-
২২জুন,২০২০ রাত তখন দশটার কাটা ছুঁইছুঁই করছে। ওজু শেষে এশার নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক তখন একটি ফোন আসলো আননউন নাম্বারে। কোনো কিছু না ভেবেই ফোন রিসিভ করলে ওপর প্রান্ত থেকে কান্না জড়িত কন্ঠের আওয়াজ, “ভাই আপনার ভাইয়ের শরীর খুব খারাপ হয়েছে। সারা শরীরে ঘাম দিয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়েছেন। বুকে প্রচন্ড ব্যথা। কান্না জড়িত কন্ঠে আকুল আবেদন, কোনো ডাক্তারের ব্যবস্হা করা যাবে কি?” ব্ন্ধু ও আপনজন ভাই মহসিনের সহধর্মিণী হাসনার কথা শুনে আমার নিজের শরীরেই ঘাম জমতে শুরু করলো। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু বললাম, চিন্তা করোনা আমি ডাক্তার নিয়ে এখনই আসছি। ফোন রেখে সাথে সাথে আমার পাড়ার মানবিক ডাক্তার আশরাফ আলী সোহাগ কে ফোন দিলাম। কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে বললাম ভাই এক্ষুনি আমার সাথে একটু হাজি পাড়ায় যেতে হবে। সে শুধু জিজ্ঞেস করলো কার বাসায় যেতে হবে ভাই? আমি বললাম মহসিনের শরীর খুব খারাপ। যেহেতু এর আগেও কয়েক বার ঐ বাসায় গিয়েছে তাই বুঝতে দেরী হলোনা। বাহিরে তখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিলো।মহসিনের বিশ্বস্ত এজাদকে বললাম তুমি সি এন জি নিয়ে সোজা ডাঃ সোহাগের বাসায় চলে আসো। সে যথারীতি সি এন জি নিয়ে ডাঃ সোহাগকে নিয়ে সোজা মহসিনের বাসায়। আমিও এরমধ্যে পৌছে গেলাম। বাসায় গিয়ে দেখলাম মহসিন ফ্লোরেই শুয়ে আছে। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাড়াতাড়ি জরুরি ঔষধের জন্য এজাদকে পাঠিয়ে দিলাম এজাদ পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যেই ঔষধ নিয়ে আসলো। ডাঃ সোহাগ নিজ হাতেই ঔষধ খাইয়ে দিলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই মহসিন বললো আগের চেয়ে একটু ভোলো বোধ করছে।” সোহাগ বললো ভাই এখন একটি ইসিজি করা জরুরি। রাত তখন সাড়ে দশটা বাজে। বাড়িতে এসে ইসিজি করার জন্য কাকে অনুরোধ করা যায় ভাবতে লাগলাম। হঠাত মনে আসলো আনিসা হেলথ্ ক্লিনিকের কর্ণধার আরেক মানবিক ব্যক্তি বাবুর কথা। সময় অপচয় না করে সাথে সাথে তাঁকে ফোন দিলাম। বাবু ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে বললো ভাই কেমন আছেন? আলহামদুলিল্লাহ, বলে তাঁর কুশলাদি জিজ্ঞেস করে ইসিজি’র ব্যাপারে আলাপ করলাম। মহসিনের কথা শুনে সে তাঁর ইসিজি’র অপারেটর নুরজাহান বেগমকে ফোন দিয়ে বাসা থেকে ক্লিনিকে আসতে বললো। আমাকে ফোন করে বললে ভাই কাউকে পাঠিয়ে নুরজাহানকে নিয়ে
যান আর এ ব্যাপারে কোন টাকা পয়সা দিতে যাবেন না। শুধু রিক্সা ভাড়াটা দিয়ে দিয়েন। বাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে এজাদকে সিএনজি সহ পাঠিয়ে দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে ইসিজি সহ নুরজাহান বাসায় হাজির হয়ে সাথে সাথে ইসিজি সম্পন্ন করে সে চলে গেলো। ডাঃ সোহাগ তখন অন্য রোগীকে attend করার জন্য বাসায় চলে আসে এবং রিপোর্টটি বাসায় পাঠিয়ে দিতে বললো। আমি ইসিজি ‘র কাগজটি এজাদকে দিয়ে তাঁর বাসায় পাঠিয়ে দিলাম। সোহাগ ইসিজি দেখে আমাকে ফোনে বললো ভাই উনার তো এ্যাটাক হয়ে গেছে। এখনি সিলেটের যে কোন হাসপাতালে সিফ্ট করা জরুরী। নতুবা অবস্হার আরো অবনতি হলে সিফ্ট করা সম্ভব হবে না।
এয়ার লিংকের আরেক পরিচালক ছোট ভাই জুয়েল খবর পেয়ে ইতোমধ্যে মহসিনকে দেখতে বাসায় এসেছে। আমি আর জুয়েল সিলেটে যাওয়ার ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিলাম। হাসনাকে বললাম তারাতাড়ি রেডি হওয়ার জন্য। জুয়েল গাড়ির জন্য ড্রাইভার নাসিরকে ফোন করলো। দশ মিনিটের মধ্যে গাড়ি আসলো।
এরিমধ্যে অসুস্হতার খবর শুনে পৌরসভার মেয়র নাদের বখত ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বাসায় এসে মহসিন এর খোঁজ খবর নিলেন এবং মনোবল চাঙ্গা রাখার পরামর্শ দিলেন। মহসিন তাঁর দুই মেয়ে ও হাসনা গাড়িতে উঠলো। সাথে জুয়েলও উঠলো এবং আমি আগামীকাল সকালে আসবো বলে তাদেরকে বিদায় করলাম। তখন রাত সম্ভবত ১১.৩০ টা। বিদায় জানিয়ে বাড়িতে আসলাম কিন্তু একটা অস্থিরতা কেন যেন মনের মাঝে বয়ে চলছে। কিছুক্ষণ পর পর জুয়েলকে ফোন দিচ্ছি আর মহসিন কেমন আছে আপডেট নিচ্ছি। মোটামুটি ভালোভাবেই সিলেটে পৌঁছে তারা প্রথমে আখালিয়ায় অবস্থিত মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করাবার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে করোনারী ইউনিটে সীট না থাকায় উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। রাত মুটামুটি ভালই ছিল কিন্তু ভোর রাতে অবস্হার অবনতি হতে থাকে। বিশেষজ্ঞ কোনো ডাক্তার তখন হাসপাতালে ছিলেন না।জুনিয়র ডাক্তারগন চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেন। ভোর
৬টার সময় মহসিন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেলো।
এতো অল্প সময়ের মধ্যে মহসিন চলে যাবে ডাঃ সোহাগ সহ আমরা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
ছয় ঘন্টার ব্যবধানে একটি তাজা প্রাণ ঝরে গেলো কিভাবে তাঁর পরিবার দুটি মেয়ে সহ আপনজনরা মেনে নেবে? এই প্রশ্নটাই বার বার উঁকি দিচ্ছিলো। বিধাতার অমোঘ সত্যকে আমাদের মেনে নিতেই হয় কিন্ত অসময়ের মৃত্যুকে মেনে নিতে খুবই কষ্ট হয়।বেদনার পাহাড় বুকে চেপে একদিন হয়তো কচি মেয়েগুলো বাবার স্মৃতিগুলো বুকে চাপা দিতে সক্ষম হবে কিন্তু বাবাহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অর্থ অর্থহীন হয়েই থাকবে যা অন্য কোনো কিছু দিয়ে পুরণ করা সম্ভব নয়।
পরপারে মহসিন ভালো থাক্ মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে এই কামনাই করছি।
শৈশব থেকে কৈশোর ও যৌবনের অধিকাংশ সময়ই একসাথে কাটিয়েছি মহসিনের সাথে। তাঁর সাথে দীর্ঘ সময়ের অনেক স্মৃতি আনন্দ বেদনার ঘটনা নিয়ে অন্য কোনো সময় না হয় লিখবো।
২৪/০৬/২০২০ইং।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 38 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ