সুনামগজ্ঞের তাহিরপুরে ১২০০ বছরের পুরনো লাউর দুর্গের সন্ধান

প্রকাশিত: 5:31 PM, November 19, 2018

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া:সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ১২০০ বছর পর মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী হলহলিয়া দুর্গ ও ব্রাহ্মণগাঁওয়ের গৌর গোবিন্দের রাজবাড়িটি। তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান হলহলিয়া গ্রাম। এই দৃশ্য দেখতে আসছেন প্রতিদিন শত শত মানুষ। গত বুধবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া উৎখনন কাজের মধ্য দিয়ে পুরনো রাজবাড়িটি তার অতীত ইতিহাস-ঐহিত্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকের প্রচেষ্টায়। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক ড. মুহাম্মদ আতাউর রহমান নেতৃত্বে দুই লাখ উৎখননের কাজ চলবে। ৯ সদস্যবিশিষ্ট টিমে রয়েছেন ঢাকা প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলম, কুমিল্লা ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টেডিয়ান ড. আহমেদ আবদুল্লাহ, সহকারী কাস্টেডিয়ান মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান, কুমিল্লা প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের সিনিয়র ড্রাফটম্যান সিরাজুল ইসলাম, জালাল আহমেদ, আলোকচিত্রকর নুরুজ্জামান মিয়া, রেকর্ডার ওমর ফারুক পাটোয়ারী ও অফিসসহায়ক লক্ষ্মণ দাস।
জানা যায়, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল (উত্তর) ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামটি সুপ্রাচীনকালে লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল। লাউড় রাজ্যের চতুসীমা ছিল পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ, পূর্বে জৈন্তিয়া, উত্তরে কামরূপ সীমান্ত ও দক্ষিণে বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এ লাউড় রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শন হাওলি প্রকৃতপক্ষে ছিল রাজবাড়ি। তৎকালীন রাজা বিজয় সিংহ রাজবাড়িটি ৩০ একর জমির ওপর প্রায় ১২০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিলেন। এই রাজবাড়িতে ছিল বন্দিশালা, সিংহদ্বার, নাচঘর, দরবার হল, পুকুর ও সীমানা প্রাচীর, যার কিছু অংশ ১২০০ বছর পরেও দৃশ্যমান রয়েছে। বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে সুনামগঞ্জের এ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে লিখিত আবেদন জানান। ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর ও ২১ নভেম্বর পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের দুজন শিক্ষক ও একদল শিক্ষার্থী গবেষক অধ্যাপক ড. অসিত বরণ পালের নেতৃত্বে হাওলি রাজবাড়ি সংরক্ষণ ও খননের লক্ষ্যে প্রাথমিক মাঠ জরিপকার্য পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে প্রাচীন নিদর্শন, ইতিহাস সম্পর্কে জানা, পর্যটন বিকাশের উদ্দেশ্যে ওই খনন কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানান তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুণেন্দ্র দেব।
খননকারী দল জানিয়েছে, প্রথম দিন হলহলিয়া দুর্গের প্রধান ফটক থেকে দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে গেছে প্রাচীরের ওপরের অংশ পাথর দিয়ে মোড়ানো। আপাতদৃষ্টিতে ধারণা করা মুশকিল যে, এর নিচে কিছু থাকতে পারে। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এ পুরাকীর্তি স্থাপনা খননের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অজানা অধ্যায়ের উন্মোচন হবে। নতুন করে রচিত হতে পারে প্রাচীন লাউড় রাজ্যের ইতিহাস। বেরিয়ে আসতে পারে লাউড় সভ্যতার ইতিহাসও।
প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক ড. মুহাম্মদ আতাউর রহমান জানান, প্রাচীন লাউড় রাজ্যের ঐতিহাসিক হলহলিয়া (হাউলি) দুর্গ খনন কাজের মধ্য দিয়ে ৫০০ বছরের পুরনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতœনিদর্শন দেখা গেছে। রাজবাড়ির সীমানা প্রাচীরের বেশ কিছু অংশ, রাজবাড়ির প্রবেশদ্বার সফলভাবে খনন করে দৃশ্যমানপর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। দুর্গের নিচে সারি সারি ৫০০ বছর আগের রঙিন অক্ষত অনেক পুরনো ইট পাওয়া গেছে। এটা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, লাউড় সভ্যতার আগেও এখানে অন্য সভ্যতা ছিল। মেঘালয়ের পাদদেশের এ স্থানে মেঘালয় পাহাড় ও সীমান্ত নদী যাদুকাটাকে কেন্দ্র করে এখানে কয়েকটি সভ্যতার নির্দশন এখান থেকে পাওয়া সম্ভব। পুরো খননকাজ শেষ হলে পর্যটকেরা অনায়াসে এ রাজ্যের নির্দশনের পাশাপাশি প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন বলে আশা করি। পরে পাশের ব্রাহ্মণগাঁও রাজবাড়িতেও খনন হবে। রাজবাড়ির দৃষ্টিনন্দন ধ্বংসাবশেষ এখনো সভ্যতার চিহ্ন বহন করছে।
জানা গেছে, লাউড় পৌরাণিক যুগের রাজ্য। এর স্থপতি রাজা ভগদত্ত। ভগদত্তের ১৯ জন বংশধর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে রাজ্য স্থাপন করেন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরূপ রাজ্য থেকে আলাদা হয়। দশম শতক থেকে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন শুরু হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমানের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল লাউড় রাজ্য। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা বিজয় মাণিক্য লাউড় রাজ্য শাসন করেন। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষে তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেও রাজ্য স্থাপন করেন। এ সময় বঙ্গের ব্রাহ্মণরা বল্লাল সেনের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে রাজা বিজয় মাণিক্যের রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। বিজয় মাণিক্যের পর কোন বংশ লাউড় শাসন করে তা এখনো অজানা। প্রাচীন ইতিহাসে লাউড় রাজ্য সব সময় স্বাধীন ছিল বলে জানা যায়। এই খননের মধ্য দিয়ে লাউড় রাজ্যের ব্যাপারে নতুন অনেক কিছু উন্মোচন হতে পারে।
তথ্য সুত্র: নয়াদিগন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 41 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ