কয়েদী থেকে কোটিপতি সুনামগজ্ঞ জেলা কারাগার কি টাকার খনি?

প্রকাশিত: 1:38 PM, July 26, 2018

অনলাইন ডেক্স: সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের কয়েদি মিজানুর রহমান ওরফে নান্নু মিয়া, ওরফে নানু দেওয়ান, পিতা- আক্কল আলী। মূল নাম নানু মিয়া হলেও কারাগারের ভেতরে ও বাইরের লোকজন তাকে বিভিন্ন নামে চেনে। কেউ নানু মিয়া, আবার কেউ নানু দেওয়ান বলে জানেন।
তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের কাউয়াজুরি গ্রামে। তার বংশের কেউ দেওয়ান উপাধি ব্যবহার না করলেও কারাগারে ঢুকার পর নানু মিয়ার নাম বদলে নানু দেওয়ান হয়ে যায়। ডাকাতি ও হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নানু দেওয়ান একাধারে দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন।
নতুন জেল কোড অনুযায়ী ১০ বছরের বেশী সাজাপ্রাপ্তদের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর কথা থাকলেও নানু মিয়ার বিরুদ্ধে নতুন একটি মামলা দায়ের করে তাকে সুনামগঞ্জে রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে কারাগারে নানু দেওয়ানের সংশোধনের কথা থাকলেও অভিযোগ আছে, ম্যাট হয়ে আরাম আয়েশে দিন কাটানোসহ নানু মিয়া মোটা অংকের টাকা উপার্জন করছেন কারাগারে ভেতরেই। নানু দেওয়ান নিজেকে জেলা কারাগারের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ডন হিসাবে গড়ে তোলেছেন । কারো কারো মতে নানু মিয়া সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কোটি টাকা আদায় করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত মিজানুর রহমান নানু মিয়া ওরফে নানু দেওয়ানের ছোট ভাই সোহেল মিয়া। সোহেল মিয়া বলেন ‘এলাকার আমাদের দুষমন ও শত্রুর অভাব নেই। কামরিবিজ গ্রামে ডাকাতি ও খুন হয়েছিল ঠিক। তবে এই ঘটনায় আমার ভাই জড়িত ছিল না। দৌলতপুরের মতিন জড়িত ছিল। পরে এই হত্যা মামলায় আমার ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে এবং তার সাজা হয়েছে। জেল থেকে আমার ভাই আমাদের কোটি টাকা দিয়েছে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমরা চার ভাই নিজেরা উপার্জন করেই চলি।’
অনেকের অভিযোগ, কোন ব্যক্তি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে ঢুকার পর অন্য কোন মামলায় অভিযুক্ত থাকলে ম্যাট হওয়ার সুযোগ পান না। কিন্তু নানু মিয়া সুনামগঞ্জ কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ম্যাটের দায়িত্ব পালন করছেন । কারা কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত এই দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি যেমন নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তেমনি জেলের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও লাভবান করাচ্ছেন। এই দেয়া-নেয়ার কারণে নানু জেল কর্তৃপক্ষের নিকট আদরণীয় এক ব্যক্তি।
কারাগার ফেরত একাধিক লোকজন জানিয়েছেন, নানু মিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মামলা চলমান রয়েছে (মামলা নং-জিআর ৫৫/২০১৬)। এই মামলাটি নাকি নানু মিয়ার ইচ্ছায়ই করা হয়েছে। মামলার বাদীও একই গ্রামের মন্তশর আলী। এই মামলাটি সাজানো মামলা, দাবি অনেকের।
কারাগারের সাবেক এক ম্যাটের অভিযোগ, সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর অন্য কোন মামলা থাকলে ম্যাট হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সুনামগঞ্জ জেল সুপার অর্থের বিনিময়ে নানুকে ম্যাটের দায়িত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে থাকার জন্য নানু মিয়া নিজেই নিজের বিরুদ্ধে একটি মামলা করিয়েছে।
নানু মিয়ার গ্রামের বাড়িসহ আশপাশ এলাকার লোকজনের দাবি কারাগারে ভেতরে থেকে নানু মিয়া ইতোমধ্যেই উপার্জন করেছেন বিপুল সম্পত্তি। দিরাইয়ের গ্রামের বাড়ি, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে বিপুল টাকার সম্পত্তি তৈরি করেছেন নানু দেওয়ান। এই তথ্য জানিয়েছেন কারাগার ফেরত একাধিক লোক ও কাউয়াজুরিসহ আশপাশের গ্রামের লোকজন।
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক (জেল সুপার) আবুল কালাম আজাদ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন,‘কারাগারে বন্দীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের কোন সুযোগ নেই। কয়েদি নান্নু মিয়া বন্দীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে এমন অভিযোগ কারাগারের ভেতরে কেউ আমাদের জানায় নি। ভেতরে থাকাকালীন সময়ে কেউ আমাদের কাছে এবিষয়ে অভিযোগ করলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করে দেখতাম। যারা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এসব অভিযোগ করছেন তারা তাদের অন্যায় স্বার্থ না পেয়ে অভিযোগ করছেন।’
কারাগার ফেরত লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, নানু মিয়ার কারাদন্ড হওয়া ও কারাগারে যাওয়ার আগে তার পরিবারের তেমন কোন বিষয়-সম্পত্তি ছিল না।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানায়, নানু মিয়া দন্ডপ্ত হওয়ার আগে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চালাতেন। তার বিরুদ্ধে হাওরে চুরি-ডাকাতিসহ নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল। এলাকার কামরিবিজ গ্রামে প্রবাসী আমতর আলীর বাড়িতে ডাকাতি ও তার জামাতা সায়েদ মিয়াকে গুলি করে খুন করার ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদ- হয় তার। নানু মিয়াকে দিরাই থানার তৎকালীন এসআই বিশ্বজিৎ সাহা দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সলফ গ্রামের হাওর থেকে গ্রেফতার করেন। ডাকাতি ও খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে প্রবেশ করে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে নানু মিয়া। কারাগারে গিয়ে হয়ে যায় কয়েদিদের দেখভালকারী ম্যাট। এরপরের ইতিহাস কাউয়াজুরিসহ আশপাশের গ্রামের লোকজনের সবার জানা। যদিও কাউয়াজুরি গ্রামসহ আশপাশ গ্রামের কেউ ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না।
স্থানীয়দের দাবি, কারাগারের ম্যাট হওয়ার পর দ্রুত বদলাতে থাকে নানু মিয়ার পরিবারের ভাগ্যের চাকা। পরিবারে স্বচ্ছলতার পাশাপাশি শুরু হয় বাড়ি-জমি কেনা। আভিজাত্যের সাথে তাল মেলাতে নানু মিয়ার বাড়িতে তৈরি করা হয়েছে পাকা দালান ঘর। বাড়ির সামনে নিজের নামে বিশাল গেইট স্থাপন করিয়েছেন। পরিবারের লোকজন বাড়িতে বসবাস করলেও রয়েছে তিনটি দামী মোটরসাইকেল। আছে একটি দামী লাইটেস, একটি বড় ইঞ্জিন চালিত নৌকা, দুইটি ছোট নৌকা ও দুইটি সিএনজি গাড়ি। সুনামগঞ্জ-সিলেটে পরিবারের লোকজনের নামে রয়েছে ক্রয় করা জমি। পাশের গ্রাম বড় নগদীপুরের হাওরে ক্রয় করেছেন মূল্যবান বোরো জমি।
নগদীপুর গ্রামের একাধিক লোক দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে জানান, আগে নানু মিয়ার পরিবারের অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু নানু মিয়া সুনামগঞ্জ জেলের ম্যাট হওয়ার পরই পরিবারের লোকজন এসব সম্পত্তি ও বাড়ি-গাড়ি কিনেছেন। তার পরিবার নগদীপুর গ্রামের মাওলানা আব্দুল হাইয়ের ভাই সফিক মিয়ার কাছ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দরে তিন কেদার বোরো জমি ক্রয় করেছেন। গত বছর জমি কিনলেও জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে এই বছর। মাওলানা আব্দুল হাইয়ের বোনের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকায় সিলেট বিমানবন্দর এলাকায় ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। ৬ লাখ টাকায় একটি লাইটেস (রেজি. নং- ঢাকা মেট্রা- গ-১২-৭৫০১), ৯ লাখ টাকায় ২ টি সিএনজি ও আড়াই লাখ টাকায় উপজেলার ধল আমিরপুর গ্রামের মোশাহিদ মিয়া কাছ থেকে ১টি ট্রলার ক্রয় করা হয়েছে। নানু মিয়ার নামে দুইটি ছোট ইঞ্জিন চালিত (গচতি) নৌকা রয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের পেছনে তাহিরপুরের বাসিন্দা গনি মিয়ার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে ১৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন।
নানু মিয়ার বাড়ির সামনে চামতি নদীর তীরে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল গেইট। সেই গেইটের নামকরণ করা হয়েছে ‘দেওয়ান বাড়ি’ নামে। এই বাড়ির জায়গা কেনা হয়েছে বড় নগদীপুর গ্রামের সফিকুল হক কাচাই মিয়া লন্ডনীর কাছ থেকে। পুরো গেইটটি দামী টাইলস দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গেইটের উপরে বড় হরফে লিখা হয়েছে দেওয়ান বাড়ি, মিজানুর রহমান (নানু দেওয়ান), পিতা: বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা, বীর: আক্কল আলী। তার পিতার নামের আগে বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা উপাধি লেখা নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা বলতে কোন কিছু না থাকলেও তার বাড়ির গেইটে পিতাকে বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে অন্তত দেড়যুগ থাকা এমন লোক এবং কাউয়াজুরি ও নগদীপুর গ্রামের একাধিক লোক জানান, নানু মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর প্রথম দিকে পরিবারের লোকজন তাকে দেখতে আসতেন না। কিন্তু পরে নানু মিয়া যখন জেলের ম্যাট হয়ে যায় ও প্রতি মাসেই আদায় করে মোটা অংকের টাকা তখন পরিবারের লোকজন নিয়মিত আসতে থাকেন। দ্রুত বদলাতে থাকে তাদের পরিবারের ভাগ্যের চাকা।
একাধিক মামলায় কয়েক দফায় দেড়যুগেরও বেশী সময় সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে থাকা জগন্নাথপুরের এক লোক নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন,‘ নানু মিয়া সুনামগঞ্জ কারাগারের হর্তাকর্তা। জেল কোড অনুযায়ী সে ম্যাট হতে পারে না। কারণ সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার নামে আরও একটি মামলা চলমান রয়েছে, কিন্তু তারপরও জেল সুপার মোটা অংকের টাকা পেয়ে তাকে ম্যাট বানিয়ে রেখেছে।’
তিনি আরও বলেন,‘ জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলার, সুবেদারকে প্রতিমাসে নানু মিয়া আগে দুই লাখ টাকা করে দিত। এখন সেই হার বেড়েছে, প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা দেয়। সবাইকে ভাগ বাটোয়ারা দেয়ার পরও নানু মিয়া অন্তত আরও কয়েক লাখ টাকা উপার্জন করে। সেই টাকা দিয়ে পরিবারের লোকজনের নামে বাড়ি, জমি, গাড়ি কিনেছে। জেলের পেছনে পরিবারের লোকজনের নামে জমি ক্রয় করেছে।’
তাহিরপুরের বাদাঘাট এলাকার এক লোক বলেন,‘ আমি ২৬ দিন জেলে ছিলাম। সিট কেনার জন্য আমি ম্যাট নানু মিয়াকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। গোসলের জন্য প্রতি মাসে ৫০০ টাকা দিয়েছি।’
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের পার্শ্ববর্তী হালুয়ারগাঁও গ্রামের এক যুবক বলেন,‘নানু মিয়া জেলের টাকা আদায়ের মূল কারিগর। তাকে টাকা না দিয়ে কেউ জেলে শান্তিতে থাকতে পারে না। এছাড়া কারারক্ষী নোমান আহমদ বন্দীদের জামিন হওয়ার পর টোকেনে নাম বা নামের পদবী পরিবর্তন করে হয়রানী করে হাজার হাজার টাকা আদায় করে। না দিলে জামিনের কাগজ নিজের কাছে রেখে পরদিন মুক্ত করে দেয়। তাকে টাকা পরিশোধ করলে তাৎক্ষণিক মুক্ত করে দেয়।’ তিনি আরো জানান, পিয়ারনগর ও হাওয়ারখাই বিলের পাশে জমি কিনেছে নানু মিয়া। তার ভাই মাঝে-মধ্যে এসে এই জায়গা দেখাশুনা করে।
সদর উপজেলার রঙ্গারচর গ্রামের নাবিল মিয়া বলেন,‘আমার বড় ভাই মিহির মিয়া আদালত থেকে গত রবিবার জামিন পেয়েছেন। কিন্তু জেল থেকে মুক্ত করতে নোমানকে নগদ ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে ৬ মাস ছিলেন শহরের পশ্চিম তেঘরিয়ার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান। তিনি ছিলেন জেলা কাগারারের চিফ রাইটার (প্রধান লেখক)। তৈয়বুর রহমান বলেন,‘ নানু মিয়া প্রতিদিনই কারাগারের ভেতরে মোটা অংকের টাকা উপার্জন করে। জেলের পশ্চিম দিকে একটা জায়গা দেখিয়ে আমাকে বলেছে সেই জাগায়টি সুনামগঞ্জ শহরের রোকেয়া কসমেটিক্সের মালিক তাহিরপুরের গনি মিয়ার কাছ থেকে কিনেছে। এছাড়াও তার আরো জমি-জমা আছে। তার একটি বড় ট্রলারও আছে বলে আমাকে বলেছে।’
শহরের ওয়েজখালী এলাকার কারাগার ফেরত এক ব্যক্তি বলেন,‘ ভাই ভয় করে নানু দেওয়ান ও জেলের অফিসারের বিরুদ্ধে কথা বলতে। আমাকে যদি আবার জেলে যেতে হয় তখন সবাই মিলে আমাকে মারধর করবে। কারণ জেলের বাইরেও নানু দেওয়ানের লোক রয়েছে। জেলের ভেতরে নানু দেওয়ানের লন্ডনী রোজী। সে প্রতিদিনই লাখ টাকা রোজী করে। সে নিজেই তার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা করিয়ে সুনামগঞ্জ কারাগারে আছে।’
কারাগার ফেরত ছাতকের কোর্ট রোড এলাকার লিটন নামের একজন বললেন,‘জেলের ভেতরে নানু দেওয়ানের নির্দেশ ছাড়া কোন কিছুই চলে না, কেউ কোনো কিছুই করতে পারে না। নানু দেওয়ানের কমান্ডেই চলে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার। টাকা পয়সা তার মাধ্যমেই আদায় করা হয়।’
আরেক অভিযোগকারী সুনামগঞ্জ শহরের জামতলার বাসিন্দা মো. সামারুল ইসলাম সাম বলেন,‘ কয়েদী নানু দেওয়ান আমার কাছে নিজেই বলেছে প্রতিদিন জেলের ভেতরে ৭০-৮০ হাজার টাকা তার আদায় হয়। আদায়কৃত টাকা থেকে জেল সুপারকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৭০ হাজার , জেলারকে ১ লাখ ৩০ হাজার, ডেপুটি জেলারকে ৫০ হাজার টাকা, সুবেদারকে ৩০ হাজার টাকা, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়।’
সামারুল ইসলাম সাম আরও বলেন,‘ নানু দেওয়ান নিজেই আমার কাছে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও দিরাইয়ে গ্রামের বাড়িসহ সবমিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি তৈরি করেছে সে। তার বাবা ও ভাই যেকোন সময় কারাগারে আসতে পারে। তারাই এসে জেল থেকে নগদ টাকা নিয়ে যায়।’
সুনামগঞ্জ শহরের উত্তর আরপিননগরের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ফরহাদ বলেন,‘ আমি ১৩ মাস সুনামগঞ্জ জেলে ছিলাম। অনেক কিছু নিজের চোখে দেখে এসেছি। ২৬ দিন আমি নিজে জেল পরিচালনার কাজ করেছি। যারা বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত তাদের কোন সমস্যা হয় না। তবে যারা গরিব, তাদের অনেক নির্যাতন সইতে হয়। জেলের ভেতরে সাধারণ মানুষকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়। বিভিন্নভাবে প্রতিমাসে নানু মিয়া ৮-১০ লাখ টাকা আদায় করে। নানু মিয়া তরুণদের যৌন নির্যাতনও করে।’
কয়েদি মিজানুর রহমান অরফে নানু মিয়া অরফে নানু দেওয়ানের ছোট ভাই সোহেল মিয়া বলেন,‘আমার ভাই এক সময় কিছু খারাপ ছিল, এই খারাপের জন্য আমাদেরও মানুষ খারাপ ভাবত। তবে মিথ্যা ঘটনায় আমার ভাইয়ের সাজা হয়েছে। এলাকার প্রভাবশালী নেতারা আমার ভাইকে ফাঁিসয়েছে। ৫-৭ বছর ধরে সুনামগঞ্জ কারাগারে আছে সে। ৫-৬ বছর ধরে ম্যাট হয়েছে। তবে আমরা তার কাছ কোন ধরনের টাকা আনি না। আমরা সবাই ব্যবসা করেই উপার্জন করি। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। তার নামে ঋণ নিয়ে কিস্তির মাধ্যমে দুইটি সিএনজি কিনেছি। সাড়ে ৪ লাখ টাকায় একটা লাইটেস কিনেছি। ট্রলার কিনেছি আমার টাকায়। সিলেটের জায়গা এখনও কেনা হয়নি, ১ লাখ টাকা দিয়ে বায়না করেছি। মাওলানা আব্দুল হাইয়ের ভাইয়ের কোন জমি আমরা কিনিনি, হাওরে আমাদের নামে কোন জমি নেই। কাচাই মিয়া লন্ডনীর ১ কেদার বাড়ি কিনেছি দেড় লাখ টাকায়। নগদীপুর বাজারে আমাদের ডিজেল ইঞ্জিনের যন্ত্রপাতি ও মেরামত করার দোকান রয়েছে। আমি নিজেও এই দোকানে কাজ করি। আমাদের ৪টি ট্রলার রয়েছে, সেগুলো থেকে টাকা পাওয়া যায়। আমরা কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে ও কিস্তি ঋণ নিয়ে এসব করেছি। সুনামগঞ্জ জেলের পেছনে জায়গা কিনলে নানু ভাই কিনতে পারে। আমি এই জায়গা দেখেছি, এই জায়গা ভাল না। মনে হয় এখনও রেজিস্ট্রি হয়নি। ’
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতি ও কয়েদি নানু মিয়ার অর্থ আদায়ের বিষয়ে সিলেট কারা সদর দপ্তরের উপ মহা পরিদর্শক (ডিআইজি) ফজলুর রহমান বলেন,‘ একজন শ্রমিক নেতা ফোন করে কিছু অনিয়মের বিষয়ে জানিয়েছিলেন। এসব ঘটনায় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘সুনামগঞ্জ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি নানু মিয়ার সাজার মেয়াদ আর এক বছর আছে।’Screenshot_20180726-124158

20180726_133740

Share on Facebook Share on Twitter Share on Google Plus

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 23 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ