স্বাগত ১৪২৩ : নবচেতনায় স্নাত হোক ধরা

প্রকাশিত: 1:19 AM, April 14, 2016

স্বাগত ১৪২৩ :  নবচেতনায় স্নাত হোক ধরা

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে/ কাল-বোশেখির ঝড়।’ জাতীয় কবির এ শব্দকলির মতোই বাঙালি প্রাণ নতুন চেতনায় জেগে ওঠার দিন আজ। ১লা বৈশাখ। শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৩। নতুন দিন, নতুন বছরের যাত্রা শুরু। কালের আবর্তে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। প্রাণে প্রাণে হিল্লোল জাগাতে, ঐকতান রচনা করতে আর মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচাতে নববর্ষ নবচেতনায় স্নাত করে সবাইকে। সেই কাকডাকা ভোরে পূর্ব দিগন্তে বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বাঙালি চিত্ত অধীর হয়। নতুনকে বরণ করে নিতে নানা আয়োজন চলে গ্রাম-গ্রামান্তরে, শহরে, নগরে।
নিরাপত্তা কড়াকড়ির মধ্যেও নতুন বছরকে বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির নানা আয়োজনে রঙে-বর্ণে, উৎসবে দেশজুড়ে বরণ করা হবে আজ। আবহমান এ বাংলার দিক-দিগন্ত ঔজ্জ্বল্যে ভরিয়ে দিতে; আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শুচি করে তুলতে আবার এসেছে বৈশাখ। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত হবে বাংলার চারদিক। ধর্ম, বর্ণ আর শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বজনীন উৎসবে মাতবে দেশ। আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি আর বাঙালি চিত্তের চিরায়ত সুরের মূর্ছনায় জাগবে দেশ। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে সকালে বের হবে সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঐতিহাসিক রমনার বটমূলে হবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। সারা দিন মুখর থাকবে রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দেশের প্রত্যেক শহর, গ্রামগঞ্জে বাঙালিরা মেতে উঠবে প্রাণের আবাহনে। বসবে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ এক অন্যরকম দিন। অন্যরকম সর্বজনীনতা। আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সেই সঙ্গে আছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা আয়োজন। এই প্রথমবারের মতো বর্ষবরণে যোগ হওয়া অনুষঙ্গ ইলিশ খাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। আজকে গণভবনের খাবার মেন্যুতে থাকছে না ইলিশ। বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ নিয়ে এতোদিন মাতামাতি হলেও সংস্কৃতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্ষবরণের সঙ্গে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই অকারণে ইলিশ নিয়ে মাতামাতির কিছু নেই। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পহেলা বৈশাখে ইলিশের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বর্ষবরণ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে রমনার বটমূলে। এটি প্রায় ৫০ বছর ধরে আয়োজন করে আসছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠতা জড়িয়ে আছে এ সন প্রবর্তনের সূচনা থেকেই। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহরা রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরি সন। হিজরি চান্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় ন্যূনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরি সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারা দেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। আর এ ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই নভেম্বর থেকে। আকবরের নবরত্ন সভার আমীর ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রথমে এর নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। আর সেই থেকে ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন এটি রূপান্তর হয়েছে বাঙালি লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবেরও। বাংলা সন। বৈশাখ। এ দুটির সঙ্গে হালখাতা জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য হয়ে। তবে পুরনো এ ‘হালখাতা’র ঐতিহ্য এখন খুব কমই দেখা যায়। যদিও অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। তবে তা হয় গ্রামীণ জনপদে।
রাজধানীতে বর্ষবরণকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। দিনটিকে নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপন করতে শহরজুড়ে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। রমনা উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। রমনা বটমূলে মূলমঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়েছে গতকালই। মঙ্গল শোভাযাত্রার সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে এদিন।
বিকালে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নববর্ষের শুভেচ্ছাসংবলিত ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে রমনা উদ্যান। বটতলায় তৈরি করা হয়েছে পহেলা বৈশাখের মূলমঞ্চ। ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনা থাকবে এখানে। মূলমঞ্চ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। নববর্ষকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে নবরূপে সাজানো হয়েছে। এখানে উন্মুক্ত অনুষ্ঠান পরিবেশনা ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ তেকে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, হাকিম চত্বর, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও চলবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো রাস্তায় আঁকা হয়েছে বৈশাখের আলপনা। সকাল থেকে শুরু হয়ে সারা দিনই চলবে নানা অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমি বর্ষবরণের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন সকালে বেলুন উড়িয়ে নববর্ষ উদ্‌যাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করবে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় এ বছর ওই এলাকায় নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা। ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বিকাল পাঁচটার মধ্যে শেষ করতে হবে উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান। এ সময়ের মধ্যেই ঘরে ফিরতে হবে নগরবাসীকে। এছাড়া, ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে বাংলা নববর্ষে দেশবাসীর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 20 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ