‘ঘুমাতে পারি না, বুক ফাইট্টা কান্না আসে’

প্রকাশিত: 5:19 AM, March 26, 2016

‘ঘুমাতে পারি না, বুক ফাইট্টা কান্না আসে’

সিয়াম সারোয়ার জামিল:

রাজিয়া বেগম। একজন বীর বীরাঙ্গনা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ছে শরীরটা। কী এক অজানা অভিমানে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন সবসময়। সব ভুলে কেবলই চুপচাপ থাকেন রাজধানীর তেজগাঁও রেলগেট সংলগ্ন অস্থায়ী বস্তিতে। ছোট্ট স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। ঘরে বসার মতো তেমন জায়গা নেই। চারদিকে মানুষের কোলাহল আর ময়লা-আবর্জনার গন্ধ।
সাংবাদিক শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। চোখে মুখে নেমে এল রাজ্যের বিষণ্ণতা। কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন তিনি! তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন একাত্তরের কথা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজিয়া বেগম স্বামীকে নিয়ে থাকতেন তেজগাঁও এলাকায়। প্রতিদিনের মতো কাজে গিয়েছিলেন রাজিয়া ও তার স্বামী। তবে দুজন দুই জায়গায়। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন গরিবের কোনো শত্রু নেই। তাই সারা দেশে যুদ্ধ চললেও তাদের কাজ একদিনের জন্যও বন্ধ করেননি তারা। কাজের খোঁজে বাংলামটর  (তৎকালীন পাক মোটর) আসতেই কতগুলো অচেনা মানুষ রাজিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। তখনো বোঝেননি রাজিয়া এর পরিণতি কী হবে। কিছু বোঝার আগেই পশুগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। পাশবিক নিযাতনের শিকার হন রাজিয়া।

সপ্তাহ খানেক পর তিনি শীর্ণ দেহে নিজেকে একটি খালের পাশে পড়ে থাকতে দেখেন। তার আশপাশে কোথাও কেউ নেই। আছে শুধু শত শত নিষ্প্রাণ নিথর দেহ, পানির ওপর ভাসছে। মৃত মানুষের গন্ধ আর রক্তে রঞ্জিত পানিতে উঁকি দিচ্ছে শাপলা শালুকের ডগা।

জীবন্ত কোনো মানুষের অস্তিত্ব দেখতে পেলেন না তিনি। এক একটি বীভৎস রাত কেটেছে ওই নির্জন খালে। পেটের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে বৈরি পরিবেশ উপেক্ষা করে মৃতদেহ সরিয়ে খেয়েছেন শাপলার ডগা আর শালুক। পিপাসা পেলে পান করেছেন রক্তমাখা খালের দুর্গন্ধযুক্ত পানি।

রাজিয়া বেগম জানান, কান্না আর ভয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যেতেন। পার করছিলেন কত বীভৎস দিন-রাত তার মনে নেই। হেমায়েত বাহিনীর (বীর বিক্রম হেমায়েত উদ্দীন) সদস্যরা তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেন। জ্ঞান ফিরে দেখেন অচেনা মানুষ, অচেনা জায়গা। আবার চিৎকার করে ওঠেন ভয়ে। কিন্তু সান্তনা দেন মানবিক লোকগুলো।

রাজিয়া জানান, বর্তমানে তিনি রাজধানীর তেজগাঁও রেলগেট সংলগ্ন অস্থায়ী বস্তিতে মেয়ের সংসারে থাকেন। মেয়ে আর নাতি-নাতনির অকৃত্রিম ভালোবাসায় বেশ ভালোই আছেন তিনি। একাত্তরের সেই দম বন্ধ করা অন্ধকারের স্মৃতিটুকু ছাড়া বেশ সুখে আছেন। তাই তিনি চান না পেছনের বেদনার কথা স্মরণ করে আবারও তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হোক। বিশেষ প্রয়োজনেও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে চান না তিনি বীরাঙ্গনা। এমনকি কৌতূহলবশতও নাতি-নাতনিরা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি তাদের এড়িয়ে যান। এ সব আলোচনা করতে নিষেধ করেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাস আর তার জীবন এক সূত্রে গাঁথা।

‘এই চুয়াল্লিশ বছরে কত মানুষ আইল যাইল। কত কিছু জানতে চাইল। কিন্তু কিছু কী লাভ হইল বল? খালি আমারে দুঃখের কথাটা স্মরণ করিয়ে দেয়া ছাড়া। দুঃখের কথা মনে কইরা কি লাভ? কষ্ট বাড়ে, যন্ত্রণা বাড়ে। ঘুমাতে পারি না। বুক ফাইট্টা কান্না আসে।’

যুদ্ধের সময়ও তেজগাঁও এলাকায় বাস করতেন। স্বামী-সংসার নিয়ে চলত তার সংসার। দুজনেই ছিলেন শ্রমিক। কখনও ওষুধের দোকানে, আবার কখনও বিভিন্নজনের দোকান পরিচ্ছন্ন করার কাজ করতেন।

‘আমার জন্ম হবিগঞ্জ, বাপের বাড়ি ওইখানেই। পরে বিয়া হইছে ঢাকায়। দেশ স্বাধীন হওনের পর সুস্থ শরীর নিয়া বাড়ি গেলে গেরামে সবাই বলাবলি করতে থাকে ‘রাজিয়া নষ্টা। ওরে পর পুরুষে নষ্ট করছে।’

প্রতিনিয়ত মানুষের ছুড়ে দেয়া উপহাসের তীর যখন তাকে বিদ্ধ করতে থাকে, তখন রাজিয়া অপমান আর অভিমানে চলে আসেন ঢাকায়। তারপর আর তার ফেরা হয়নি স্মৃতিবিজড়িত গ্রামে। যে গায়ের আলো হাওয়া ধীরে ধীরে রাজিয়াকে ‘রাজিয়া’ করে তুলেছে।

‘মুক্তিযোদ্ধা স্বর্ণলতা ফলিয়ার সহায়তায় শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা হইছিল। দেখা করছি শেখ হাসিনার সঙ্গেও। তারপর আর কিছু হয় নাই। শুনছি সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিতাছে। জানি না, আমি হেইডা পামু কিনা। তয় যুদ্ধে যে ইজ্জত হারাইসি, দুর্নাম কামাইসি। মুক্তিযোদ্ধা হইলে তো একটু ইজ্জত বাড়েই।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 30 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ