‘আব্বা, ভিক্ষা কইরা অইলেও তারারে টেখা দ্যাও’

প্রকাশিত: 4:57 AM, March 21, 2016

‘আব্বা, ভিক্ষা কইরা অইলেও তারারে টেখা দ্যাও’

নিউজ ডেস্ক : ‘আব্বা, ভিক্ষা কইরা অইলেও হেরারে তুমি টেখা দ্যাও। নাইলে এরা আমারে মাইরা ফালাইব। হাসপাতালো নিয়া আমার কিডনি বেইচ্যা দিব। আব্বা, এরা আমারে খুব মারতাছে। আমি সহ্য করতাম ফাররাম্ না। ও মাই গো। এর ফরই লাইন কাইট্যা দেয় হেরা।’ শনিবার দুপুরে র‌্যাব-৩ দফতরে এ প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই ছেলে সমর আলীর সঙ্গে কথোপকথন এবং তার দুঃসহ প্রবাসজীবনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন সিলেটের দরিদ্র কৃষক কনু মিয়া। চাকরির নামে আফ্রিকার দেশ সুদানে পাঠিয়ে তার ছেলেকে জিম্মি করে একের পর এক মুক্তিপণ আদায় করেছে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। ছেলের জীবন বাঁচাতে দফায় দফায় মুক্তিপণ দিয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে রীতিমতো নিঃস্ব কনু মিয়া। সবটুকু জমি বিক্রির পর ছেলের একদণ্ড শান্তির জন্য সর্বশেষ চার মাস আগে তিন দফায় এলাকার সুদখোরদের কাছ থেকে চড়া সুদে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। তবে ঋণের সুদ এরই মধ্যে মূলধনের সমান হয়ে গেছে। কথা বলার একপর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কনু মিয়া। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তিনি। এ সময় পাশে থাকা র‌্যাব সদস্যরাও তাদের চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি।

তবে আশার কথা, কনু মিয়ার ছেলে সমর আলীকে র‌্যাব-৩-এর সদস্যরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় বেনগাজি থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে সমর আলী লিবিয়ার ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে অবস্থান করছেন। তাদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার চাটিবরে। এ ঘটনায় জড়িত অপরাধে মানব পাচারকারী চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এরা হলেন আবদুল কাইয়ুম, খোকন আহমেদ আজগর ওরফে আলী, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. নাসির উদ্দিন, ফারুকুল ইসলাম রাসেল, মো. রুবেল হাওলাদার ও মো. বাদল হাওলাদার। এ ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কনু মিয়ার পরিবারকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে মানবিক দিক থেকে চেষ্টা করছেন র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, ছেলে সমর আলীকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কনু মিয়াকে কাইয়ুমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন পাশের গ্রামের দিদার খাঁ। সাড়ে চার লাখ টাকায় ছেলেকে লিবিয়ার ভিসা দেওয়া হবে বলে রফা হয়। সে অনুযায়ী বিমানবন্দরের ওপেন হোটেলে কাইয়ুমকে দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন কনু মিয়া। বাকি দুই লাখ টাকা বিদেশে যাওয়ার পর দেওয়া হবে বলে মৌখিকভাবে চুক্তি হয়। জাল পাসপোর্ট দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ভিজিট ভিসায় সমর আলীকে সুদানে পাঠায় ওই চক্র। একই ফ্লাইটে সমরের সঙ্গে আরও পাঁচজনকে সুদান পাচার করে তারা। গোলাম সারোয়ার বলেন, ঠিক দুই দিন পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে সমর আলী তার বাবাকে ফোন করে অবহিত করেন, তিনি কাইয়ুমের লোকজনের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন। পরে কনু মিয়া ঢাকায় এসে কাইয়ুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে চার কিস্তিতে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও বিকাশের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু এর পরও তার কাছে আরও এক লাখ টাকা দাবি করেন কাইয়ুম।

ফারুক নামেই পাসপোর্ট হয় সমরের : জাতীয় পরিচয়পত্রে সমর আলী হলেও ফারুক মিয়া নামে সমরের পাসপোর্ট বের করে দেন কাইয়ুম। পাসপোর্ট অধিদফতরের একশ্রেণির অসৎ কর্মচারীর সহায়তায় ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে পাসপোর্ট করে দেওয়া হয় সমরকে। তবে সুদান থেকে ভিজিট ভিসা পাঠিয়েছিলেন খোকন। সেখানে অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের অন্যতম সদস্য শাহীন সুদান বিমানবন্দর থেকে সমরকে রিসিভ করে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে টানা এক মাসের বেশি সময় মুক্তিপণের জন্য অমানবিক নির্যাতন চালান। পরে সমরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজিতে। সেখানে নেওয়ার পর বেড়ে যায় নির্যাতনের মাত্রা। একপর্যায়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি র‌্যাব-৩ বিষয়টি অবহিত হয়ে সমরকে উদ্ধার এবং অপরাধীকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া শুরু করে। র‌্যাব সূত্র জানায়, গ্রেফতারদের মধ্যে রুবেল ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জাল পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতা করতেন। অন্যদিকে টিকিট করে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার করার বিষয়ে সহযোগিতা করতেন কাইয়ুমের অপর সহযোগী। খোকন প্রথমে সুদানে যাত্রীদের আটক রেখে তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। পরে পাসপোর্ট নিজেদের কাছে নিয়ে লিবিয়ার একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে ট্রাকে করে ভুক্তভোগীদের পাচার করা হতো। র‌্যাব-৩ অধিনায়ক বলেন, সমর আলী এখন লিবিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসে আছেন। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাকে বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ভিডিও বার্তায় গা শিউরে ওঠা বর্ণনা : লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় সমর বলেন, সুদান আসার পরই তার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। আলী নামের একজনের নেতৃত্বে পাচারকারীরা তাকে মারতে মারতে মেঝেতে ফেলে দিত। তার বুকের ওপর উঠে উল্লাস করত। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে মাঝেমধ্যেই জ্ঞান হারাতেন সমর। বাথরুমে আটকে রাখা হতো তাকে দিনের পর দিন। এ সময় তাকে কোনো খাবার দেওয়া হতো না। নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য সমরকে বাধ্য করা হতো পাচারকারীদের টাকা দেওয়ার জন্য তার বাবাকে ফোন করতে। ভয়াবহ নির্যাতনের একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সমর। মারা যেতে পারেন এমনটি ভেবে বাধ্য হয়ে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাকে একটি ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসা করায়। এক মাস পর পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাকে পাঠিয়ে দেয় লিবিয়া। সড়কপথে এক মাসে তারা পৌঁছায় লিবিয়ায়। ওই সময় তার মতো আরও আটজন ওই গাড়িতে ছিলেন। তবে সেখানে গিয়ে থেমে থাকেনি নির্যাতন। এবার রাসেল, সবুজ ও মাসুম নামের তিনজন দফায় দফায় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। জীবন বাঁচাতে তাদের কথা অনুযায়ী ফোন দিতেন সমর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 16 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ