দেগুইতোসহ ৫ জনকে তলব

প্রকাশিত: 1:26 AM, March 19, 2016

দেগুইতোসহ ৫ জনকে তলব

মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ ৫ জনকে তলব করেছে ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের রাজকোষ কেলেঙ্কারিতে ফিলিপাইনে তোপের মুখে রয়েছেন আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার শাখার সাবেক ম্যানেজার দেগুইতো। এবারে তার সঙ্গে আরও চারজনকে তলব করে সমন জারি করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। এ খবর দিয়েছে ফিলিপাইনের দৈনিক এনকোয়ারার।
তলব করা বাকিরা হলেন- মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগ্রোসাস, আলফ্রেড সান্তোস ভেরগারা ও এনরিকো টিওডোরো ভ্যাসকুয়েজ। এই নামগুলো আরসিবিসি ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহার করা অ্যাকাউন্টের সন্দেহভাজন নাম বলে উল্লেখ করেছে দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি)। শুক্রবার জারি করা সমনে তাদের ১২ ও ১৯শে এপ্রিল বিচার বিভাগে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাটের ঘটনা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে এএমএলসি। বিচার বিভাগের সামনে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। সহকারী সরকারি কৌঁসুলি গিলম্যারি ফে প্যাকামারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘বিচার বিভাগে হাজির হতে ব্যর্থ হলে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার খারিজ বলে বিবেচিত হবে এবং মামলটি অভিযোগকারীদের দাখিলকৃত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য উপস্থাপন করা হবে।’
এএমএলসির আনা অভিযোগ অনুযায়ী, অজ্ঞাত চার ব্যক্তির জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ছাড়পত্র দিয়েছিলেন দেগুইতো। তদন্তে দেখা গেছে অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয়া নথিপত্রগুলো বানোয়াট। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ‘অ্যাকাউন্ট খোলার পর নয় মাস পর্যন্ত দেগুইতো তাদের পরিচয় যাচাই করতে ব্যর্থ তো হয়েছেনই; একইসঙ্গে তাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া অর্থ ওঠানোর সুযোগও দিয়েছেন।’ এএমএলসির বক্তব্য, ‘দেগুইতো অর্থ উত্তোলনের ছাড়পত্র দিয়েছেন। তিনি জানতেন ওই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া অর্থ। কেননা, ওই লেনদেন ঠেকাতে ততক্ষণে আরসিবিসি ব্যাংকের কাছে অনুরোধ এসেছিল।’
‘দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেছেন দেগুইতো’
গতকাল ফিলিপাইন সিনেটের রুদ্ধদ্বার শুনানিতে আরসিবিসি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো দুই জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেছেন। সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তিওফিস্তো গুইঙ্গোনার বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে ফিলিপাইনের জিএমএ নিউজ। ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংক থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করে হ্যাকারচক্র।
খবরে বলা হয়েছে, প্রায় ৮.১ কোটি ডলার হাতানোর ঘটনায় ওই দুই জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। শুনানির সাইডলাইনে সাংবাদিকদের তিওফিস্তা বলেন, ‘মনে হচ্ছে আরও বড় ব্যক্তিরা এখানে জড়িত।’ তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি তিনি। শুধু জানিয়েছেন, দেগুইতো আরসিবিসি ব্যাংকের দুই নির্বাহীর নাম জানিয়েছেন, যাদের হাত এ লেনদেনে থাকতে পারে।
এর আগে একটি নির্বাহী শুনানির অনুরোধ জানিয়ে সফল হন দেগুইতো। রুদ্ধদ্বার ওই শুনানিতে তিনি সিনেট কমিটির কাছে সব বলবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। সে অনুযায়ী একটি রুদ্ধদ্বার শুনানির আয়োজনও করা হয়। তবে সেখানে দেগুইতো কী বলেন তা জানা যায়নি।
সহকর্মীকে ৫০ লাখ পেসো দিতে চেয়েছিলেন দেগুইতো
ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো তার এক সহকর্মীকে ৫০ লাখ পেসো দিতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮.১ কোটি ডলার চুরি হওয়ার ঘটনায় নীরব থাকতেই হয়তো ঘুষ হিসেবে এ অর্থ দিতে চেয়েছিলেন দেগুইতো। রোমুয়ালদো আগারাদো নামে ওই সহকর্মী নিজেই গতকাল সিনেট শুনানিতে এসব বলেছেন। এ খবর দিয়েছে এনকোয়ার। আরসিবিসি’র ওই শাখায় কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের প্রধান ছিলেন আগারাদো। তিনিই জানান, আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা আদ্রিয়ান ইয়ুজুইসোর ঘরে ১২ই ফেব্রুয়ারি দেগুইতো তাকে ওই প্রস্তাব দেন।
এর আগে আগারাদো সিনেট শুনানিতে বলেন, তিনি দেখেছেন অন্তত ২ কোটি পেসো উইলিয়াম গো নামের এক ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করা হয়। এরপর ওই অর্থ দেগুইতোর গাড়িতে তোলা হয়। তিনি ওই অর্থ নিয়ে বাড়িও চলে যান। আগারাদোর এ সাক্ষ্যে আরও বিপাকে পড়েন দেগুইতো। আরসিবিসি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার ওপরই দোষ চাপিয়ে আসছিলেন। তবে দেগুইতোর দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি এ কাজ করেন।
আগারাদোর এ সাক্ষ্যের বিপরীতে উত্তর দিতে দেগুইতো অস্বীকার করেন। তবে তিনি বারবার রুদ্ধদ্বার শুনানিতে সব বলবেন বলে জানাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে সিনেট কমিটি তাকে নিয়ে বিশেষ সেশনে বসতে রাজি হয়। সেখানে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অবঃ) জন গোমেজ।
আগারাদো বলেন, দেগুইতোর সহকারী অ্যাঙ্গেলা তোরেসের আদেশ মোতাবেক তিনি ২ কোটি পেসো গুনে দিতে সহায়তা করেন ৫ই ফেব্রুয়ারি। ওই অর্থ উইলিয়াম গোর অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলিতও হয়। উইলিয়াম গো’র দাবি, তার নামে দেগুইতো ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। এরপর দেগুইতোর রুমে নিয়ে যাওয়া হয় ওই অর্থ। ব্যাংকের মেসেঞ্জার জোভি মোরালেস বাক্সে ভরা ওই অর্থ নিয়ে যায় দেগুইতোর গাড়িতে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ই ফেব্রুয়ারি আগারাদোকে নিরীক্ষকরা প্রশ্ন করেন। এ সময় অ্যাঙ্গেলা তোরেস তাকে বলেন, তিনি যেন নিরীক্ষকদের ওই অর্থ দেগুইতোর গাড়িতে তোলা নিয়ে কিছু না বলেন। কারণ, তাতে বিপদে পড়বেন দেগুইতো। এ কারণে আগারাদো তখন নিরীক্ষকদের কিছু বলেননি।
একপর্যায়ে সিনেটররা আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মীদের আরও হলফনামা জমা দিতে বলে। কিন্তু ব্যাংকের আইনজীবী ফার্নান্দেজ এস্তাভিলো বলেন, অ্যাঙ্গেলা তোরেস যে হলফনামা দিয়েছেন, তা শপথভঙ্গ! এস্তাভিলো বলেন, তোরেস দাবি করলেন তিনি উইলিয়াম গোর গাড়িতে ওই অর্থ ঢুকান। এমনকি তাকে উত্তোলনের স্লিপে স্বাক্ষরও করান। কিন্তু গার্ড লগে এ বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যায় না। আবার তোরেসের বক্তব্য আর আগারাদোর বক্তব্য বিপরীতমুখী। এ ছাড়া প্রমাণ অনুযায়ী, তোরেসের হলফনামা মিথ্যা। এস্তাভিলো আরও বলেন, ব্যাংক তোরেসের বিরুদ্ধে শপথভঙ্গের মামলা করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 16 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ