এবার টাইগারদের চোখ বিশ্বকাপে

প্রকাশিত: 2:05 AM, March 8, 2016

এবার টাইগারদের চোখ বিশ্বকাপে

স্পোর্টস ডেস্ক : ধর্মশালায় ৯ মার্চ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব শুরু করবে বাংলাদেশ। তার আগে ৩ ও ৫ মার্চ দুটি অনুশীলন ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ রেখেছিল আইসিসি। বাংলাদেশ এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠতে পারবে না, এটা ধরে নিয়েই সূচি ঠিক করা হয়েছিল! কিন্তু এশিয়া কাপের দুর্দান্ত ফর্ম আইসিসিকে বাধ্য করল সেই দুটি ওয়ার্ম আপ ম্যাচ বাতিল করতে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশকে খেলার সুযোগ দেওয়া যাবে না বলে যে আইন করেছিল আইসিসি, এটা যেন সেই ‘ষড়যন্ত্রের’ আরো একটা মোক্ষম জবাব। এরপরও কি ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বাংলাদেশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যাবে?

প্রেরণা এশিয়া কাপ

ভারতের বিপক্ষে রবিবারের ফাইনালে টাইগারদের পরাজয় হলেও, সেটা বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হলো, দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে গুঁড়িয়ে ফাইনালে ওঠা। কারণ বাংলাদেশের গায়ে একটা বদনাম লেগে ছিল এতদিন এবং সেটি হলো, ওয়ানডেতে ভালো দল হলেও অন্য দুই ফরমেটে সে রকম কিছু নয়। টাইগাররা সেই বদনামটা ঘুচিয়েছে এশিয়া কাপে। ২০ ওভার ম্যাচেও যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার হতে জানে, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আত্মবিশ্বাস এখন টগবগ করছে মাশরাফিরা।

সংক্ষিপ্ত ভার্সনের ক্রিকেটে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, হংকংয়ের কাছে হার, র‌্যাঙ্কিংয়ে আফগানিস্তানের নিচে চলে যাওয়া বাংলাদেশকে যে এশিয়া কাপে খুব বড় কিছু করবে, সে স্বপ্ন দেখেনি ক্রিকেটপ্রেমীরাও। বর্তমান এবং সাবেক তিন চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে এশিয়া কাপে খেলার সুযোগটাকেই টি-২০ বিশ্বকাপের বড় প্রস্তুতি হিসেবে নিতে হয়েছিল হাতুরুসিংহের শিষ্যদের। অথচ সেই নতুন ফরম্যাটের এশিয়া কাপেই ট্রফির লড়াইয়ে ভারতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ! এই যে ধেই ধেই করে বাংলাদেশ ক্রিকেট উঠে আসছে, এর রহস্য কী? মাশরাফির অধিনায়কত্ব, একঝাঁক ফাস্ট বোলার, সৌম্য-তামিমের দৃঢ়তা, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের উঠে আসা?

স্পিন নির্ভরতা থেকে পেস সমৃদ্ধ বোলিং

আগে বাংলাদেশকে সবাই চিনত স্পিন নির্ভর দল হিসেবে। কিন্তু মাশরাফির অধিনায়কত্বে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের বোলিং অ্যাটাক। এখন সেই বাংলাদেশ পেস নির্ভর হয়ে উঠেছে। আর এবারের এশিয়া কাপে উইকেটে সবুজ ঘাসের ছোঁয়া থাকায় বাংলাদেশ একাদশে চার পেসার ব্যবহার করেছে। অবধারিতভাবে চার পেসারের শীর্ষে আছেন মুস্তাফিজুর রহমান। যদিও ইনজুরির কারণে এশিয়া কাপের শেষ দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। কিন্তু বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পেস বিভাগের নেতৃত্ব দিবেন তিনিই। কী নেই তার বোলিংয়ে? গতি, সুয়িং, স্লোয়ার, কাটার। বৈচিত্র্যময় বোলিং অ্যাকশন তার।

বাংলাদেশের ঝুঁলিতে একজন ওয়াসিম আকরাম, একজন গ্লেন ম্যাকগ্রা কিংবা কোর্টনি ওয়ালস নেই। অথবা হালের পেস সেনসেশন ডেল স্টেইন, মিচেল স্টার্ক কিংবা লাসিথ মালিঙ্গা নেই; কিন্তু যে দলটি তিলে তিলে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থানকে পোক্ত করে নিচ্ছে, তারাই যে এক সময় ইতিহাসে বিশ্ব কাঁপানো পেসারদের কাতারে ঠাঁই করে নিতে যাচ্ছে, সেটি স্বীকার করে নেওয়ার উপযুক্ত সময় বোধকরি এখন। কোন জাদুকাঠির বলে এভাবে বদলে গেল বাংলাদেশের পেস অ্যাটাক? ক্রিকেট প-িতদের মতে, এই পরিবর্তনটা একদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে অর্জিত হয়েছে। যার সমন্বিত রূপটাই দেখা যাচ্ছে এখন। পরিবর্তনটা শুরু হয়েছে গত বছর জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে। তখনও কিন্তু স্পিন নির্ভর বোলিং আক্রমণ বাংলাদেশের। পেস অ্যাটাক নির্ভর বোলিং আক্রমণের ধারণাটাই এসেছে মূলত গত বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় থেকে।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বাউন্সি উইকেটের কথা চিন্তা করেই মাশরাফি, রুবেল আর তাসকিনদের দিয়ে আলাদাভাবে নিয়মিত অনুশীলন চলেছে। রুবেল-তাসকিনরা বোলিং করেছেন মেটাল উইকেটে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন তৈরি করা হয়েছিল। যেখানে বোলিং করে নিজেদের আরও পাকাপোক্ত করে তুলতে পেরেছেন মাশরাফিরা। গত বছর মুস্তাফিজ আবিষ্কার হওয়ায় এখন বাংলাদেশের পেস অ্যাটাক আরো সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় হয়েছে। বোলারদের এই অনুশীলনে শুধু যে বোলাররাই লাভবান হয়েছে, তা নয়। লাভ হয়েছে ব্যাটসম্যানদেরও। কারণ এমন বাউন্সি উইকেটে, গতিময় পেসারদের কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, তা প্রস্তুতিতেই রপ্ত করে ফেলেছে ব্যাটসম্যানরা। যার সফল বাস্তবায়ন বিশ্বকাপ থেকে এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে এশিয়া কাপ পর্যন্ত।

বিশ্বকাপেও মূল অস্ত্র পেস বোলিং

পেসাররা জ্বলে না উঠলে ম্যাচ জেতা সবচেয়ে কঠিন কাজ। ব্যাটসম্যানদের কাজ সহজও করে দেন পেসাররা। গত আট মাসে সেটাই করে এসেছেন বাংলাদেশের বোলাররা। টি-২০ বিশ্বকাপেও টাইগারদের প্রধান অস্ত্র হতে পারে পেস অ্যাটাক। রোববারের ফাইনালের পর একটা দিন বিরতি দিয়ে ভারতের ধর্মশালায় চলে যাবেন মাশরাফিরা। সেখানে অনেক চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে। বাংলাদেশের গরম আবহাওয়া থেকে হঠাৎ ধর্মশালার ঠা-ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে টাইগারদের। ধারণা করা হচ্ছে, তখন ধর্মশালায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকবে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভালো প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশ টানা ম্যাচ খেলার মধ্যে থাকলেও খেলোয়াড়রা চাপে পড়ে যেতে পারেন অনভ্যস্ত কন্ডিশন এবং আবহাওয়ার কারণে। যদিও এশিয়া কাপের সুখকর অভিজ্ঞতাটা বেশ কাজে আসতে পারে সেখানে।

টি-২০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে বেশ ভালো কৌশল নেয় বিসিবি। খুলনা ও চট্টগ্রামে দুই দফা ক্যাম্প শেষ করার পর ঢাকায় অনেকটা ধর্মশালার কন্ডিশনের আদলে অনুশীলন করেছেন মাশরাফিরা। ধর্মশালার আবহ শের-ই-বাংলায় তৈরি করাকে গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ধর্মশালার ঠা-া আবহাওয়ার কারণে সেখানকার উইকেট হবে পেস সহায়ক। সে কারণেই ব্যাটিং পিচের পরিবর্তে এশিয়া কাপের জন্য সবুজ পিচ তৈরি করেছেন কিউরেটর গামিনি সিলভা। ধর্মশালার অনুশীলন শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে পেয়ে খুশি মাশরাফিরাও। অধিনায়কের মতে, ‘ভারতে আমাদের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নেই তেমন। সাকিব আইপিএলের কল্যাণে কিছু ম্যাচ খেলেছে। ধর্মশালাতে একেবারেই কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

আমি বলছি না, এখানে ওই কারণে উইকেটটা তৈরি হয়েছে। আমি বলতে চাইছি, ওখানে এমন উইকেট হলে আমাদের জন্য অনুশীলনটা হয়ে যাবে। এমন উইকেটে খেলা আমাদের জন্য খারাপ হচ্ছে না। বিশ্বকাপে আমাদের যে ম্যাচগুলো আছে, অনেকটা এমন উইকেট হতে পারে।’ এশিয়া কাপের ম্যাচগুলোতেও ধর্মশালার অনুশীলন ঠিকই করতে পেরেছে বোলাররা। বিশেষ করে নতুন বলে। সব দলের ব্যাটিং লাইন আপকে বেশ ভালোই ধাক্কা দিতে পেরেছে বাংলাদেশের চার পেসার- মাশরাফি, মুস্তাফিজ, তাসকিন, আল আমিন। টি-২০ বিশ্বকাপেও পেসাররা তুরুপের তাস হয়ে উঠবেন বলেই টিম ম্যানেজমেন্টের আশা।

স্বপ্ন অনেক, রেকর্ড করুণ

টি-২০ বিশ্বকাপে সুখের স্মৃতি নেই বললেই চলে। আছে হতাশার স্তূপ। ২০১৪ সালে নিজ দিশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে হংকংয়ের কাছে হেরে যেতে হয়েছিল। পরের রাউন্ডে সব কটি ম্যাচে হার। গত পাঁচ টি-২০ বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে সাকুল্যে একটি ম্যাচ জেতা। তবে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরলে সেটি হবে অন্যায়। রেকর্ড কিংবা পরিসংখ্যান সব সময় কথা বলে না। অতীত দিয়ে এখনকার বাংলাদেশকে পরিমাপও করা যাবে না।

ধর্মশালায় বাছাই পর্বটা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। সেখানে খেলতে হবে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে। ওরা ইউরোপের দল। ওদের পেস আক্রমণ নিয়েই চিন্তা। পেস সহায়ক উইকেটে তাদের ফাস্ট বোলাররা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের বেশ ভোগাতে পারেন। তাছাড়া তাদের ব্যাটসম্যানরা পেস বোলিং এবং ফাস্ট উইকেটে ভালো খেলে থাকেন। যেটা চিন্তার কারণ মাশরাফিদের জন্য। বাছাই পর্ব পেরোনো গেলে নট আউট পর্বে ভালো করার ঢের সম্ভাবনা আছে। যদিও সাকিব ছাড়া অন্য কারোর ভারতে খেলার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। তবে ওখানকার কন্ডিশন অনেকটা এখানকার মতোই। বাংলাদেশ আসলে কতদূর যাবে সেটি বলা মুশকিল। তবে এশিয়া কাপের প্রেরণা টাইগারদের স্বপ্ন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে নিশ্চয়ই।

মাশরাফি আছেন বলেই…

শ্রীনিবাসনের আইসিসি বাংলাদেশকে বৈশ্বয়িক কোনো টুর্নামেন্টে দেখতে চায়নি বলে নতুন নতুন নিয়ম করে দেয়াল সেটে দেওয়া হয়। টি-২০ বিশ্বকাপে শুরু থেকে সরাসরি মূল পর্বেই খেলত বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে খেলতে হচ্ছে বাছাই পর্ব। আগে ১২ দল নিয়ে হতো টি-২০ বিশ্বকাপ। সেটি কমিয়ে করা হয় ১০ দল। ক্রিকেটের বিশ্বায়নের বুলি আউড়িয়ে এ কেমন বৈশ্বয়িক টুর্নামেন্ট? বাংলাদেশের মতো দলকে কেন বাছাই পর্ব খেলতে হবে? আইসিসিকে বাংলাদেশ প্রথম জবাব দিয়েছিল গত বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে। এরপর পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা তিনটি সিরিজ জিতে মাশরাফিরা ঘোষণা করলেন, এখন তারা ছোট দল নয়। সর্বশেষ চমক এশিয়া কাপে। এবার কি টি-২০ বিশ্বকাপে? আইসিসিকে কী আরেকটা জবাব দিতে পারবে টাইগাররা? যে দলে মাশরাফির মতো কা-ারি, সে দলের পক্ষে যেকোনো কিছুই সম্ভব!

আকাশের চাঁদ হাত দিয়ে ধরার স্বপ্ন কখনো দেখান না, অথচ আকাশের চাঁদটাই বারবার হাত দিয়ে ধরছেন মাশরাফি। মনের গভীরের বিশ্বাসটাই তার কাছে বড়। আর তাতেই পাচ্ছেন একটার পর একটা সাফল্য। মাশরাফি শুধু অধিনায়কই নন, দলের পিতা সমতুল্যও বটে। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অর্জুনা রানাতুঙ্গা। তার বলের গতি এখন একশ তিরিশের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। ব্যাটেও নিয়মিত প্রচুর রান করে দেন, এমন নয়। তবু মাশরাফিকে বাদ দিয়ে টিম নামানো যায় না, কারণ গোটা দলের রিমোট সব সময় তারই হাতে । তিনি প্লেয়িং আবার এক অর্থে নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেনও। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আজ অবধি কেউ এমন লোকগাথার নায়ক হয়ে উঠতে পারেননি। আর তার মতো ক্যাপ্টেন আছে বলেই স্বপ্ন বড় দেখে গোটা দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 15 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ