দুই পত্রিকা ষড়যন্ত্র এখনো চালিয়ে যাচ্ছে

প্রকাশিত: 5:54 AM, March 1, 2016

দুই পত্রিকা ষড়যন্ত্র এখনো চালিয়ে যাচ্ছে

094846Mir-Kasem-Ali-(3)প্রান্ত ডেস্ক:প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত দুটি পত্রিকা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এখনো দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। গণতন্ত্রকে কোনো রকমে ধরাশায়ী করে অসাংবিধানিক সরকার আসলে তাদের কপাল খুলবে, এই আশায় তারা ষড়যন্ত্রেই লিপ্ত থাকে। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্রে কোনো কাজ হবে না। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের এই অগ্রগতি কোনো ষড়যন্ত্রই রুখতে পারবে না ইনশাল্লাহ।
গতকাল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনি বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি-জামায়াতের খুন-খারাবি, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে দেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ দেশের মানুষ সন্ত্রাস-খুন, ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং পছন্দ করে না, ভবিষ্যতেও করবে না।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিতে সংসদে গৃহীত হয়। এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী দশম জাতীয় সংসদের নবম অধিবেশনের সমাপ্তি সম্পর্কিত রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে সমাপ্তি ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি ভুল করেছে। সেই ভুলের খেসারত দেশের জনগণ কেন দেবে? তাদের রাজনৈতিক ভুলের খেসারত তাদেরই দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর এক ঘণ্টার ভাষণে বর্তমান সরকারের সফলতা-উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি ওয়ান ইলেভেনের ষড়যন্ত্র, নোবেল বিজয়ী একজনের অপতত্পরতা এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস-ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তির এমডি পদ হারানোর ক্ষোভের আগুনে পুড়েছে গোটা দেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই দুই পত্রিকায় ২০টি বছর ধরে আমার বিরুদ্ধে লেখা হচ্ছে। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকে এ দুটি পত্রিকা আমি পড়ি না। ভাল কিছু লিখলেও শেষের দিকে আমাকে খোঁচা দেবেই তারা। এ খোঁচা খেয়ে আমি আত্মবিশ্বাস হারাব। তাই পড়বো কেন? তিনি বলেন, আমাকে দুর্নীতিবাজ বানাতে তার পত্রিকা যতকিছু লিখেছে সেগুলো নাকি ডিজিএফআই সাপ্লাই দিয়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে লেখা থাকে নির্ভীক সাংবাদিকতা। আলোর কথা বলে তারা কী অন্ধকারের কাজ করে। এই লেখাগুলো ছাপালো কিন্তু সূত্র লেখা হলো না কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, ১/১১’ পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকতে প্রথমেই আমার ওপর আঘাত আসে। আমি তো সরকারে ছিলাম না, বিরোধী দলে ছিলাম। তবে কেন প্রথমে আমাকে গ্রেফতার করা হলো? আমাকে দুর্নীতিবাজ বানাতে ওই দুটি পত্রিকা একের পর এক মিথ্যা সংবাদ ছাপিয়ে গেছে। ডিজিএফআইয়ের ব্রিগেডিয়ার আমিন-বারীদের হাত থেকে ওই সময় কেউই রেহাই পায়নি। ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ, শিক্ষক-ছাত্রদের ওপর যারা নির্যাতন করেছে তাদের সঙ্গে কী সখ্যতা ছিল তা কী প্রথম আলোর মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনামরা দিতে পারবেন? তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে এই দুটি পত্রিকা হয় ডিজিএফআইয়ের এজেন্ট হয়ে কাজ করেছে নতুবা মাইনাস টু ফর্মুলার সঙ্গে জড়িত ছিল। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত না থাকলে অসত্য সংবাদ ছাপাবে কেন? ব্রিগেডিয়ার আমিন ও বারীর চোখের আলো হয়েছিলেন ওই দুটি পত্রিকা। তাদের কাজই হলো দেশে যাতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যেতে চাইলে তারা রাস্তায় নামুক, জনগণের কাছে যাক। মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে আমরা রাজনীতি করি। রাজনীতি ও ক্ষমতায় যাওয়ার এতো শখ থাকলে- মানুষের ভোট নিয়ে তারা আসুক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাও দেশের জনগণের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে, মসজিদে আগুন দিয়েছে, শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, ১৮টি ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করেছে, ৭০টি সরকারি অফিস পুড়িয়েছে, ৮টি লঞ্চ পুড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে কোন কিছুই রেহাই পায়নি। কিন্তু তাদের সেই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি দেশের জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সংসদ অধিবেশন দেশের জনগণ দেখতে পারেন। বিএনপি যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তাদের সংসদে খিস্তিখেউড়, নোংরা ও অসভ্য বক্তব্য, গালিগালাজ, হুমকি-ধামকি কোন ভদ্রলোক দেখতে বা শুনতে পারতো না। এখন সেই অবস্থা নেই। দেশের জনগণ এখন সংসদের কার্যবিবরণী কান পেতে শুনতে পারছেন। বিরোধী দল সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার পাশাপাশি ভাল কাজের প্রশংসা করছে। সংসদে বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখছে।
নোবেল জয়ী একজনের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আরেকজন জড়িত। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। একজন সম্পাদক লোক যোগাতে নেমেছিলেন। কিন্তু কেউই আসেননি। ওই ভদ্রলোককে আমিই মোবাইল ফোনের ব্যবসা দিয়েছিলাম। ব্যাংকের এমডি পদ আইন লঙ্ঘন করে ১০ বছর পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন। আইন লংঘন করলেন, মামলায় হারলেন- আর সব দোষ যেন আমার ওপর। শুধু তাই নয়, এমডি পদ হারানোর ক্ষোভ পড়লো পদ্মা সেতুর ওপর। আমেরিকার বন্ধুকে দিয়ে অর্থ বন্ধ করালেন।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুতে আমাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলো। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম। এখনও সেই প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি। একটি এমডি পদ হারানোর ক্ষোভের আগুনে জ্বললো আমাদের বাংলাদেশ। নোবেল পুরস্কার পেয়েও একটি এমডির পদ ছাড়তে পারেন না। ওখানে কী মধু আছে। এতো বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কারের তবে মর্যাদাটা কোথায় থাকলো? অনেকে ভেবেছিল বিশ্বব্যাংক থেকে টাকা না নিয়ে বাংলাদেশ চলতে পারবে না। তিনি বলেন, এদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। গণতন্ত্রকে এতটুকু ধরাশায়ী করা যায়, অগণতান্ত্রিক কিছু আসে তাদের কপাল খুলবে- সেই অবস্থা বাংলাদেশে কখনো হবে না। এ আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে জাতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল উপস্থাপন করেছেন। দেশ যে আর্থ-সামাজিকসহ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতির ভাষণে তা উঠে এসেছে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট একটি জঙ্গি সংগঠন। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তারা এখনও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যারা হত্যা, খুন, অস্ত্র, বোমাসহ ধরা পড়ছে তাদের সবার গোড়া খুঁজলে দেখা যাচ্ছে আগে হয় ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রদল করেছে। পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই কারণ তারা দিনরাত পরিশ্রম করে দেশকে রক্ষা করছেন।
রাস্তায় বের হয়ে দেশের মানুষ কেমন আছে তা দেখে আসতে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের দাবির জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন দেশের অবস্থা আগের মতো নেই। এখন প্রযুক্তির যুগ। এখন কোনোকিছু দেখতে নিজে যেতে হয় না। কাউকে একটি মোবাইল দিয়ে পাঠালে ঘরে বসেই সবকিছু দেখা যায়। আমি ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টুঙ্গিপাড়ার মাজার দেখতে পাই, অনেক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করি। তিনি বলেন, দেশের কোনো মানুষ যাতে ফুটপাতে না থাকে, ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত না থাকে, সেই নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব মানুষকে নিয়ে গিয়ে আমরা ভাল রাখলেও পরে বেরিয়ে এসে সেই পুরনো কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এটাই সমস্যা। এ ব্যাপারে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বিশ্বের কেউ আর বাংলাদেশকে অবহেলার চোখে দেখে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে আমরা দেশে আয় বৈষম্য কমিয়েছি। এখন শহর ও গ্রামের মধ্যে আয় বৈষম্য অনেকাংশ হ্রাস পেয়েছে। যানজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা বেড়েছে। তাই যাদের একটি গাড়ি দরকার, তারা ২/৩টা গাড়ি কিনছে। এসব কারণেই যানজট বাড়ছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশ আমরা গড়বো, উন্নত করবো, আমরাই পারব- এটা মনে রেখেই সবাইকে চলতে হবে। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা পারবো না কেন? আমরা কেন পরমুখাপেক্ষী হব? আমরা সবাই মিলে কাজ করলে দেশ দরিদ্র থাকার কথা না।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের মানুষ কথা বলতে পছন্দ করে। এখন ৩২টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছি। আর এসব টিভিতে সমানভাবে কথা বলে যাচ্ছেন, আবার বলছেন কথা বলার স্বাধীনতা নেই! সত্য-মিথ্যা দিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে সবাই কথা বলেই যাচ্ছেন। কাউকে তো বাধা দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করি না। সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছি। মিডিয়ার জন্য আমি যত সুযোগ দিয়েছি, অতীতে কেউ দেয়নি। কিন্তু আমিই সবচেয়ে বেশি ভিকটিম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা সামান্য কারণে শিশু হত্যা করে তারা সমাজের ঘৃণ্য জীব। এর আগে কয়েকজন শিশু হত্যাকারীর সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আমি আদালতের কাছে অনুরোধ জানাব, শিশু হত্যাকারীদের যেন তারা সর্বোচ্চ শাস্তি দেয় যাতে ভবিষ্যতে কেউ শিশু হত্যার সাহস না পায়। পাড়া-মহল্লায় শিশু নির্যাতন বন্ধে দেশের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, হঠাত্ করেই শিশু হত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতো ছোট ছোট শিশুদের প্রতি এমন নিষ্ঠুর জীঘাংসা কেন? এসব খুনিরা সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট জীব, এদের প্রতি আমি ঘৃণা জানাই। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষের প্রতি অনুরোধ জানাব, শিশু হত্যার সঙ্গে জড়িত খুনিরা পালিয়ে থাকলে তাদের ধরিয়ে দিন, সরকার তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করবে।
সম্প্রতি গ্যাস বিস্ফোরণে পুরো একটি পরিবার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে রয়েছেন একটি মাত্র দিয়াশলাইয়ের কাঠি খরচ হওয়ার ভয়ে গ্যাস জ্বালিয়ে রাখেন। যেখানে গ্যাসের চুলা জ্বলবে সেখানকার জানালা, দরজা খুলে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, একটু সতর্ক হলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 7 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ