এক দশকে পথশিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ

প্রকাশিত: 5:44 AM, February 26, 2016

এক দশকে পথশিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ

094846Mir-Kasem-Ali-(3)প্রান্ত ডেস্ক:ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে পথশিশু ও শ্রমজীবী শিশুদের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালিত শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট; কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটের ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ এবং ‘কার্যক্রমে’র পাতা দুটিতে নেই কোনো তথ্য। সাইটে শুধু ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের পরিচিতি এবং ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুলগুলোর তালিকার পাতাটিই তথ্যবহুল। ট্রাস্টে গিয়ে জানা গেল, প্রায় ২০ হাজার শিশুর শিক্ষা, উপবৃত্তিসহ সার্বিক কার্যক্রমের জন্য তাদের বছরে বরাদ্দ মাত্র ১৩ কোটি টাকা। এদিকে ইউনিসেফের হিসাবে, গত এক দশকে পথশিশুর সংখ্যা হয়েছে দ্বিগুণ। ২০০৫ সালে পথশিশু ছিল পাঁচ লাখ ২৫ হাজার, বর্তমানে সেই সংখ্যা হয়েছে নয় লাখ ৯০ হাজার; কিন্তু বিভিন্ন পথশিশু প্রকল্পে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়ন গত ১০ বছরে কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার নূ্যনতম চাহিদা পূরণ না হওয়ায় পথশিশুদের অসহায়ত্ব বাড়ছে, অহরহ নির্যাতিত হচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধে।
শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘শ্রমজীবী শিশুদের জন্য একশ’টি স্কুল পরিচালনা ছাড়া ট্রাস্টের অন্য কোনো কার্যক্রম নেই। বেশ কয়েকবার ট্রাস্টের কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি সেসব।’ তিনি জানালেন, ট্রাস্টের ব্যাংকে রাখা ২২ লাখ টাকার তহবিল থেকে সুদ বাবদ যে আয় হয় তা দিয়ে নির্বাহ করা হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা।
পথকলি থেকে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট- কোনো অর্জন নেই :পথশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য ১৯৮৯ সালে তৎকালীন সরকার ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন করে। পরে সরকার পরিবর্তন হলে এর নাম পাল্টে ‘শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট করা হয়। তখন এর কার্যক্রমও শুধু শ্রমজীবী শিশুদের জন্য স্কুল পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। বর্তমানে ট্রাস্টের অধীনে সারাদেশে ১০০টি স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। যার মধ্যে ৯১টি সাধারণ ও ৯টি কারিগরি। সাধারণ স্কুলে ১৬ হাজার ও কারিগরি স্কুলে পড়ছে চার হাজার শিশু।
ট্রাস্ট স্কুলের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির জন্য ব্যয় হয় বছরে ১৩ কোটি টাকা। প্রায় সাড়ে তিনশ’ শিক্ষকের বেতন-ভাতার জন্য বছরে সাত থেকে আট কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে ট্রাস্টের তহবিলে আছে ২২ লাখ টাকা। এ টাকার সুদ বাবদ আয় দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। এসব স্কুলে কমপক্ষে পাঁচজন করে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও ৫০ শতাংশ স্কুলেই চারজনের বেশি শিক্ষক নেই। এ ছাড়ার কার্যক্রম তদারকি করার মতো জনবলও নেই। সবচেয়ে করুণ অবস্থা কারিগরি স্কুলগুলোতে। এখানে শিক্ষার্থী হাতেগোনা ১০-১২ জন। কারিগরি শিক্ষার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়, সেগুলো অনেক সময়ই স্থানীয়ভাবে ধার করে আনা হয়। কারণ একবার একটা যন্ত্র অকেজো হলে তা কেনার মতোও টাকা থাকে না।
ট্রাস্টের পরিচালক দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকার যতটুকু সুবিধা রেখেছে, তার মধ্যে থেকেই ট্রাস্টের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর বাইরে ট্রাস্টের আর কিছুই করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ট্রাস্টের মাধ্যমে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে আরও বড় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
এ ধরনের কিছু প্রস্তাবও বিভিন্ন সময় দেওয়া হয়েছে; কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।’
এদিকে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রয়েছে সেবা কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে বিশ্বব্যাংক। যা দিয়ে সাতটি বিভাগীয় শহরের ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড প্রোটেকশন সার্ভিসে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়। এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সম্প্রতি অনিয়মের কারণে প্রকল্প থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাই ওয়ান স্টপ সার্ভিস কর্মসূচিও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
দাতারাও সহায়তার পরিমাণ কমাচ্ছে :পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা দেশের বৃহৎ এবং বলতে গেলে একমাত্র সক্রিয় বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধান ওয়াহিদা বানু জানান, গত এক দশকে পথশিশুদের জন্য বিদেশি সহায়তার পরিমাণ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশে নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথা। এ ছাড়া দাতা সংস্থা তাদের মূল্যায়নে এও বলছে, নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই পথশিশুদের জন্য প্রকল্পে বড় আকারের অর্থায়ন অব্যাহত রাখার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ‘অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পথশিশু কার্যক্রম ছোট করে ফেলেছে, কেউ কেউ প্রকল্প থেকে সরে এসেছে।’
ওয়াহিদা বানু জানান, অপরাজেয় বাংলাদেশ এ মুহূর্তে সারাদেশে প্রায় আড়াই লাখ শিশুকে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। আগে কিশোর বয়স পর্যন্ত দেওয়া হলেও এখন ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কারণ ১৫-১৬ বছর বয়সের পর অনেকেই কাজ না পেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই একেবারে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৫ শতাংশ পথশিশু মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংক্রান্ত একটি সূত্র জানায়, পথশিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পথশিশু কোনো না কোনোভাবে অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, একজন পথশিশুর জন্য প্রথম প্রয়োজন হয় খাদ্যের। এ ছাড়া তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক বিকাশের জন্য বিনোদন, খেলাধুলার ব্যবস্থা করাও জরুরি; কিন্তু এসবের কোনো কিছুরই ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় ক্ষুধার নিদারুণ বাস্তবতায় তারা স্কুলেও আসে না।’ তিনি বলেন, ‘আসলে প্রকল্পের ভিত্তিতে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মেয়াদ শেষ হলে প্রকল্প থাকে না, সব আয়োজনও বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রকল্পভিত্তিক নয়, স্থায়ীভাবে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে রাষ্ট্রকে এই শিশুদের দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে দেশ মধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে পথশিশুদের জীবন করুণ থেকে করুণতর হচ্ছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 7 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ