কিশোরগঞ্জে ১৫ মাসের শিশুকে হত্যা মায়ের

প্রকাশিত: 2:58 AM, March 6, 2016

কিশোরগঞ্জে ১৫ মাসের শিশুকে হত্যা মায়ের

নিউজ ডেস্ক : বারবার আম্মু, আম্মু বলে জড়িয়ে ধরাটাই কাল হয় ১৫ মাস বয়সী শিশু মাহাথিরের। মুহূর্তেই মায়ের হাতে থাকা তরকারি কাটা ধারালো বঁটি চলে যায় কচি শিশুর গলায়। মুরগি জবাইয়ের মতো করে সালমা নিজ হাতেই জবাই করে কোলের শিশুপুত্রকে। গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোনোর কয়েক মুহূর্ত পরেই থেমে যায় মাহাথিরের হৃদস্পন্দন। আশ্চর্য স্বাভাবিকতায় সালমা শিশুপুত্রের সেই নিথর দেহ ফেলে রাখে ঘরের দরজার চৌকাঠের সামনে। বাড়ির পাশের পুকুর থেকে রক্তাক্ত হাত-মুখ ধুয়ে এসে নিজেই চিৎকার করে বলে ‘ছেলে আর কান্না করবে না’ সবাইকে এ কথা জানিয়ে উল্লাস করে।
শিশুপুত্রকে হত্যার এই নৃশংস বর্ণনা ঘাতক মা সালমা আক্তারের। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের প্যারাভাঙ্গা গ্রামের বাবার বাড়িতে নিজ পুত্রকে গলা কেটে হত্যার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এভাবেই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয় সালমা। স্বাভাবিক গলায় জানায়, তার মাথা ঠিক নেই। তাই সে এই কাজ করেছে। থানায় ডিউটি অফিসারের কক্ষে এই প্রতিবেদকের কাছেও শিশুপুত্রকে হত্যার কথা বলতে গিয়ে ভাবলেশহীন থাকে সালমা আক্তার। সালমা আক্তার জানায়, সে সকালে রান্না করার জন্য তরকারি কাটছিল। এ সময় মাহাথির তার কাছে এসে বারবার তাকে ডাকাডাকি করছিল। একপর্যায়ে তার হাতে থাকা বঁটি দিয়ে মাহাথিরকে কোপ দেয়।
মায়ের হাতে প্রাণ হারানো শিশু মাহাথির মোহাম্মদ শাফির মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই আলমগীর হোসেন জানান, শিশুটির  গলার মাঝ বরাবর অংশে বঁটির কোপ দেয়া হয়েছে। এছাড়া থুতনির নিচেও একটি কোপের চিহ্ন রয়েছে। এতে গলা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। তিন ইঞ্চি পরিমাণ চামড়া অক্ষত থাকায় দেহ থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
পুলিশ জানায়, শনিবার সকাল ১১টার দিকে সদরের মারিয়া ইউনিয়নের প্যারাভাঙ্গা গ্রামে সালমা আক্তার তার বাবা আসাদ উল্লাহ্‌র বসতঘরে শিশুটিকে তরকারি কাটা বঁটি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বঁটিটি উদ্ধার ও অভিযুক্ত মা সালমা আক্তারকে আটক করে। এ ব্যাপারে হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির বাবা মো. আবুল কালাম বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ১৬/১৭ বছর আগে করিমগঞ্জের গুজাদিয়া ইউনিয়নের টামনি আকন্দপাড়া গ্রামের মৃত আবদুল লতিফ মুন্সীর ছেলে মো. আবুল কালামের সঙ্গে প্যারাভাঙ্গা গ্রামের আসাদ উল্লাহর মেয়ে সালমা আক্তারের বিয়ে হয়। কালাম-সালমা দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র মাহাথির মোহাম্মদ শাফি সবার ছোট। বড় তিন কন্যাসন্তানের মধ্যে সুরাইয়া আক্তার (১৪) স্থানীয় শামসুন্নাহার-ওসমান গণি শিক্ষা নিকেতনের নবম শ্রেণীর ছাত্রী, কলি আক্তার (১২) গুজাদিয়া আবদুল হেকিম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী এবং তাইয়্যেবা আক্তারের বয়স ৫ বছর।
নিহত শিশুটির চাচাতো ভাই মোজাম্মেল হক জানান, সালমা আক্তার প্রায় সময়েই শিশুপুত্র মাহাথির মোহাম্মদকে নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতো। এর আগেও একাধিকবার সে তার শিশুপুত্রকে পানিতে ফেলে হত্যার চেষ্টা করেছে। তবে সেসব সময় অন্যরা বিষয়টি টের পাওয়ায় শিশুটি প্রাণে বেঁচে যায়। সপ্তাহখানেক আগে সালমা একাকী প্যারাভাঙ্গা গ্রামের বাবার বাড়িতে চলে যায়। এ অবস্থায় শুক্রবার সকালে স্বামী আবুল কালাম শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে সারা দিন থাকার পর নানা ও খালাদের আবদারের মুখে মাহাথিরকে তাদের কাছে রেখে টামনি আকন্দপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। রাত পোহাতে না পোহাতেই ছেলেকে হত্যার খবর পান আবুল কালাম।
সকাল ১১টার দিকে এই ঘটনা ঘটলেও বড় দুই বোন সুরাইয়া ও কলি মায়ের হাতে খুন তাদের একমাত্র ছোট ভাইটির খবর পায় বেলা দুটার দিকে। সকাল সাতটার দিকে দুই বোনই বাড়ি থেকে কোচিং ও স্কুলের উদ্দেশে বেরিয়ে যায়। ফেরার পথে বেলা দুটার দিকে রাস্তায় লোকজনের কাছে তারা তাদের প্রিয় আদরের ছোট ভাইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত এই মৃত্যু সংবাদটি পায়। ভাই হারানোর শোকে সেই থেকে তারা কেবল কেঁদেই চলেছে। একমাত্র পুত্রের এমন মৃত্যু সংবাদে মূহ্যমান বাবা আবুল কালামও। কেন ছেলেকে ওইভাবে শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসেছিলেন, এ আক্ষেপ করে নিজেকেই দুষছিলেন বারবার। টামনি আকন্দপাড়া গ্রামে আবুল কালামের বাড়িতে এখন কেবলই শোকাহত মানুষের ভিড়। কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে শিশুটির মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে টামনি আকন্দপাড়া গ্রামে নিয়ে যাওয়ার পর স্বজনদের বুক ফাটা কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মুর্শেদ জামান জানান, শিশুটিকে হত্যার কথা মা সালমা আক্তার স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আবুল কালাম বাদী হয়ে সালমা আক্তারকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেছেন। এ ব্যাপারে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 18 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ