পরিবর্তন আসছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে

প্রকাশিত: 2:47 AM, March 6, 2016

পরিবর্তন আসছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে

নিউজ ডেস্ক : পরিবর্তন আসছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে। দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামোতে আনা হচ্ছে বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী বেশকিছু পরিবর্তন। সেই সঙ্গে দীর্ঘ দুইযুগ পরে সংশোধনী আনা হতে পারে দলের ঘোষণাপত্রেও। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিগত কিছু পরিবর্তনসহ থাকছে বাক্য ও শব্দগত পরিবর্তন।
চেয়ারপারসনের ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের যোগ্যতা, ক্ষমতা ও তাদের অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, নীতিনির্ধারণী ফোরামসহ জাতীয় নির্বাহী কমিটির পরিসর, এক নেতা একপদ নীতি, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা সাবজেক্ট কমিটি গঠন, নতুন সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি, সহযোগী সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি, তৃণমূল কমিটি গঠনের নতুন নির্দেশনাসহ কাউন্সিলরদের কাছ থেকে শতাধিক প্রস্তাব এসেছে গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটিতে। জমাকৃত প্রস্তাবগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে কয়েক ডজন প্রস্তাব বাছাই করা হয়েছে গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির বৈঠকে। বাছাইকৃত প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ জমা দেয়ার জন্য  কমিটির সদস্যদের দেয়া হয়েছে।  আগামীকাল এ উপকমিটির দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। এদিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ৩২ সদস্যের এ উপকমিটি ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কংগ্রেস, বিজেপি ও যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রও বিশ্লেষণ করেছেন। উপকমিটির  আলোচনার ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো সুপারিশসহ চেয়ারপারসনের কাছে পাঠানো হবে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে মনোনীত প্রস্তাবগুলো কাউন্সিলে উত্থাপনের অনুমোদন দেবেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির একাধিক সদস্য জানান, সবচেয়ে বেশি কাউন্সিলরের প্রস্তাবে রয়েছে এক নেতা এক পদের বিষয়টি। বাছাইকৃত প্রস্তাবগুলো কাউন্সিলে অনুমোদিত হলে বিএনপির নীতি নির্ধারণী ফোরাম থেকে শুরু করে কার্যনির্বাহী কমিটির বিভিন্ন স্তর ও তৃণমূলে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন আসবে। সাংগঠনিকভাবে কার্যকর হবে এ পরিবর্তিত বিএনপি। কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য গত মাসে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতা ও কাউন্সিলরদের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করেছিল বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চেয়ারপারসন পদে নির্বাচনের কিছু যোগ্যতাসহ বয়সসীমা কমানোর প্রস্তাব এনেছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল মান্নান। সেটা হলে বয়সসীমা ৩০ থেকে ২৫ বছরে কমিয়ে আনা হতে পারে। দলের বর্তমান গঠনতন্ত্রে চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের অনুপস্থিতিতে কারা এ দায়িত্ব পালন করবেন সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন বিধি নেই। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠেছে। এছাড়া কিছুদিন আগে চেয়ারপারসনের সঙ্গে প্রভাবশালী একটি দেশের রাষ্ট্রদূত বিষয়টি খালেদা জিয়ার কাছে জানতেও চেয়েছেন। বাস্তবতা বিবেচনা করে চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট বিধি যুক্ত করা হতে পারে। বর্তমানে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠনে চেয়ারপারসনের ১০ ভাগ সদস্যের যে কোটা রয়েছে তা বিলুপ্তের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবটি কাউন্সিলে উত্থাপন ও পাস হলে নতুন প্রক্রিয়ায় ওই ১০ ভাগ সদস্য জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে স্থান পাবেন। এছাড়া দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে নতুন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে সৃষ্টি করা হয়। কাউন্সিলররা সর্বসম্মতভাবে তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে সে পদে নির্বাচিত করেন। এবার কাউন্সিলের আগেই চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। চেয়ারপারসনের ক্ষমতাবলে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হয়। আসন্ন কাউন্সিলে সে সংশোধনীতে পাস করা হবে। তবে ঢাকা জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদের পরিবর্তে কো-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
উপকমিটিতে জমাকৃত প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কমিটির পরিসর বাড়ানোর বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল হালিম স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫, ভাইস চেয়ারম্যানের সংখ্যা ২৫, উপদেষ্টার সংখ্যা ৫০, যুগ্ম মহাসচিব ৮, সাংগঠনিক সম্পাদক ৮ এবং  নির্বাহী কমিটির সংখ্যা ৪০৫ করার প্রস্তাব এনেছেন। বর্তমানে দলের গঠনতন্ত্রে ৩৫১ সদস্যের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে জাতীয় নির্বাহী কমিটির পরিসর কমানোর প্রস্তাবও এসেছে উপকমিটিতে। পদের মর্যাদা রক্ষা ও বিষয়ভিত্তিক উপ-কমিটি গঠনে সুবিধার জন্য একজন সিনিয়র নেতা এ প্রস্তাব এনেছেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্বও কমিটির আকার বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়। মাঝারি কিন্তু কার্যকর একটি কমিটি গঠনের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন চেয়ারপারসন।
দলের বিষয়ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক কমিটি গঠন ও ১৭টি সাবজেক্ট কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে উপকমিটিতে। প্রস্তাবিত সাবজেক্ট কমিটির মধ্যে রয়েছে- জাতীয় পরিকল্পনা ও অর্থ, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পল্লী উন্নয়ন, খাদ্য ও কৃষি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শ্রমকল্যাণ, মহিলা, যুব সমপ্রদায়, আন্তর্জাতিক বিষয় ও শিশুকল্যাণ ইত্যাদি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে কাউন্সিলের মাধ্যমেই নির্বাচিত হবে এসব কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যবৃন্দ। আহ্বায়করা সম্পাদক আর সদস্যরা নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু একাই এনেছেন ১০টি প্রস্তাব। এর মধ্যে রয়েছে- দলে যোগদানের পাঁচ বছরের আগে গুরুত্বপূর্ণ পদ না দেয়া, ইউপি-থানা-জেলা কমিটির সম্পাদক পদের সংখ্যা বাড়ানো, তৃণমূল থেকে জাতীয় নির্বাহী কমিটি পর্যন্ত সব পর্যায়েই প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে পদাধিকার বলে সদস্য করা, বিষয় ভিত্তিক উপকমিটি গঠন, প্রতি বছর ১০ ভাগ প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে এমপি-উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রতি তিন মাস পরপর ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যায়ে বর্ধিত সভা করা, দুই বছরের জন্য গঠিত তৃণমূল কমিটিগুলোর নির্ধারিত সময়ের পরপরই কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন ইত্যাদি।
প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক কাজী আসাদ তার প্রস্তাবে দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটি প্রিন্সিপাল পদ ও ৫টি সহ-প্রশিক্ষণ সম্পাদক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছেন। যেখানে প্রিন্সিপাল পদের যোগ্যতা হবে উচ্চডিগ্রিধারী ও বিএনপির রাজনীতিতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা। কাউন্সিলরদের তরফে যুব মহিলা দল গঠন, তৃণমূল দল, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম ও বাস্তহারা দলকে সহযোগী সংগঠন করার প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মকে সহযোগী সংগঠন হিসেবে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব দিয়েছেন নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সংগঠনটির সভানেত্রী শামা ওবায়েদ। এছাড়াও তিনি জঙ্গিবাদ দমন, সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদ উত্থান বিষয়ে বিএনপির লক্ষ্য, মতামত ও অবস্থান সুনির্দিষ্ট করা এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জানমাল, সহায়-সম্পত্তির সব ধরনের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখের প্রস্তাব এনেছেন। অন্যদিকে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর এবং তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরিতে মহিলা দলের একটি যুব শাখা গঠনের ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন সিনিয়র নেতারা। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা নেতাদের কোন পরামর্শ সভায় অন্তর্ভুক্ত না করার প্রস্তাব দিয়েছেন পাবনা জেলা বিএনপির সভাপতি মেজর (অব.) কেএস মাহমুদ। দলের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও ৬৫-ঊর্ধ্ব নেতাদের জন্য ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার সিনিয়র নির্বাহী সদস্যপদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী দলের কমিটি গঠনে ৩০ ভাগ নারীর অংশগ্রহণের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন পদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীকে পদায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রস্তাব থাকছে। সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব এসেছে দলের তৃণমূল কমিটি গঠনের বিষয়ে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইউনিয়নের ওয়ার্ড কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সর্বশেষ অনুমোদিত কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মিলে কমিটি গঠন করবেন। তারাই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হবেন। কমিটি অনুমোদন দেবেন সুপার ফাইভ হিসেবে পরিচিত সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ১নং যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচন। একইভাবে ইউনিয়ন, থানা, পৌরসহ সব কমিটি গঠনের করা যেতে পারে। এছাড়া ভোটার তালিকায় নাম উঠলে বাংলাদেশের নাগরিকদের দলের সদস্য করা যাবে। তৃণমূল নিয়ে দলের সাবেক এমপি আকবর আলী তার প্রস্তাবে বলেছেন, উপজেলা কমিটি দাখিলের ১৫ দিনের মধ্যে যদি সংশ্লিষ্ট নেতারা অনুমোদন না দিয়ে ওই কমিটি অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। তিনি ইউনিয়ন কমিটির সদস্য সংখ্যা ৭১ থেকে ৮১ করার প্রস্তাব করেছেন। এছাড়া দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আনা হয়েছে বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 17 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ