বলিউডে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার

প্রকাশিত: 1:22 AM, March 1, 2016

বলিউডে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার

ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডে নানা রকম কাজের সুযোগ রয়েছে। নায়ক-নায়িকাদের সহকারী হিসেবে কাজ করে আয় করা যায় অনেক টাকা। এ রকম হাজারো রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে নারী পাচার করতো ওরা। নারী পাচারে কাজ হতো তিন স্তরে। একটি চক্র জেলা-উপজেলার নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের সংগ্রহ করতো। তারা এনে দিতো ঢাকার পাচারকারী চক্রের কাছে। তারা ভারতীয় পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দিতো উচ্চমূল্যে । পাচারের শিকার তরুণীদের ফিল্ম সিটি হিসেবে খ্যাত মুম্বইতে নেয়া হতো ঠিকই, কিন্তু বলিউডের কোনো কাজে নয়, তাদের বাধ্য করা হতো বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে কাজ করতে। শুধু তাই না, ভারতে আটকে রেখে মেয়েকে দিয়ে কথা বলানো হতো পরিবারের সঙ্গে। দেশে ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে দাবি করা হতো বিপুল টাকা। এরকম একটি নারী পাচারকারী চক্রকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- রোকন (২১), আয়েশা আক্তার আশা (২৫), আমির (২২), হাসান খন্দকার (৩০), হাবিব (৩২), মিল্টন (২২) ও সামাদ (৩২)। এ সময় পাচারকারীদের হেফাজত থেকে চার তরুণীসহ ১২টি পাসপোর্ট, ১১টি জাল ভিসা, বিমানের ৫১টি জাল টিকিট ও ৫৩টি ভুয়া নিয়োগপত্র, একটি ভিডিও ক্যামেরা ও ১৪টি  মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। এই চার তরুণীকে বেনাপোলের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
গতকাল বিকালে কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর র‌্যাব-১২ সিরাজগঞ্জ ক্যাম্পে রওশন আরা নামে এক নারী তার মেয়ে সাবিনাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে। অভিযোগে বলা হয়,  সে গাজীপুরে গার্মেন্টে কাজ করতো। ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর ১৭ই আগস্ট কর্মস্থলে ফিরে যায় সাবিনা। কিন্তু এরপর থেকেই তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ক’দিন পর ভারতীয় মোবাইল নম্বর থেকে তার মেয়ে ফোন করে জানায় তাকে  ভারতে পাচার করা হয়েছে। পাচারকারীরা তাকে ফেরত দেয়ার বিনিময়ে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ওই অপহরণের ঘটনাটি নিবিড়ভাবে তদন্ত করতে গিয়ে তারা এই পাচারকারী চক্রের সন্ধান পান। পরে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের বড়বাড়ি এলাকা থেকে এ চক্রের সদস্য রোকন ও আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে সোহাগী নামে অপর এক ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রোকন, আয়েশা ও সাবিনাকে বলিউডে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করে দেয়ার কথা স্বীকার করে। একই কায়দায় সোহাগীকেও ভারতে পাচারের প্রক্রিয়া চলছিল বলে তারা জানায়। রোকন ও আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব সূত্র জানায়, তারা সোহাগী নামের ওই তরুণীকে ভারতে পাচার করে দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। চক্রের অপর দুই সদস্য আমির ও হাসানের সঙ্গে তাদের ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। পরে র‌্যাব ফাঁদ পেতে সোহাগীকে হস্তান্তরের নাম করে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আমির ও হাসানকে আটক করে। এসময় র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে তাহের নামে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা তাহের পালিয়ে যায়। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে আমির ও হাসান জানায়, সোহাগীকে তারা ভারতের কলকাতায় এক দিদির কাছে বিক্রির জন্য সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। সোহাগীর ‘দাম’ ধরা হয়েছিল দুই লাখ টাকা। কলকাতার ওই দিদি তাকে মুম্বইয়ের পতিতালয়ে কাজে লাগাতো। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, আমির ও হাসানকে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে যাত্রাবাড়ী থানাধীন বউবাজারের একটি বাসার তৃতীয় তলায় আরেক তরুণীকে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে বলে জানায়। পরে র‌্যাব কর্মকর্তারা ওই বাসা থেকে শিরীন নামে এক তরুণীকে উদ্ধার করে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, পাচারকারী চক্রের অপর সদস্যদের ধরতে তারা সোহাগী ও শিরীনকে হস্তান্তরের ফাঁদ পাতে। এ জন্য তারা ছদ্মবেশে গত রোববার তাদের নিয়ে বেনাপোল সীমান্তের সূর্যখালী এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে পাচারকারী চক্রের হাবিব, মিল্টন ও সামাদকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা কলকাতার সেই দিদির এদেশীয় প্রতিনিধি। তাদের কাজ হলো রাতে সীমান্ত পার করে দেয়া। এই তিন জনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে রাজধানীর ফকিরাপুল পানির ট্যাংকি এলাকা থেকে মামুন মির্জাকে আটক করা হয়। এসময় সালমান নামে আরেক পাচারকারী পালিয়ে যায়। এসময় মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার হেফাজতে পাচারের উদ্দেশে রাখা দুই কিশোরী রয়েছে বলে স্বীকার করে। পরে র‌্যাবের অপর একটি অভিযানিক দল দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ এলাকা থেকে শারমিন ও রিয়া নামে দুই কিশোরীকে উদ্ধার করে। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন মির্জা জানায়, সে শারমিনকে ১৫ দিন ও রিয়াকে ৩ মাস ধরে তার হেফাজতে রেখেছে। তাদের দু’জনকে মামুন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডে কাজের কথা বলে ভারতে পাচার করে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সঙ্গে কেরানীগঞ্জের বাসায় দুই তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সময় ভিডিও করে তা প্রচারের হুমকি দিয়ে পতিতাবৃত্তি করাচ্ছিল। র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এই চক্রটি গত ৪-৫ বছরে অন্তত পাঁচ শতাধিক তরুণীকে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে বলে স্বীকার করেছে। কখনো কাজের প্রলোভন, কখনো বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের পাচার করতো ওরা। এই সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা হলো তাহের ও সালমান। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সাবিনাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চলছে: র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সিরাজগঞ্জ থেকে পাচার হওয়া সাবিনাকে ভারতের মুম্বই থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন তারা। এ জন্য তারা পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাবিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 22 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ