বিএনপিতে ফের সক্রিয় হাওয়া ভবন কুশীলবরা

প্রকাশিত: 12:03 PM, February 13, 2016

বিএনপিতে ফের সক্রিয় হাওয়া ভবন কুশীলবরা

khপ্রান্তডেস্ক: ১০বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নেই বিএনপি, নেই আলোচিত হাওয়া ভবনের অস্তিত্বও। কিন্তু দলটিতে যেন ‘হাওয়া ভবন’ বেঁচে আছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই হাওয়া ভবনের মূল ব্যক্তি বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডনে প্রবাস জীবনে। তার প্রভাবশালী সঙ্গীদের কেউ জেলে,কেউ লন্ডনসহ নানা দেশে। এই কুশীলবদের অবস্থান এখন নানান জায়গায় থাকলেও বিএনপির ‘কন্ট্রোলিং পাওয়ার’ নিতে ফের সক্রিয় হয়েছেন তারা। ‘ভাইয়া’ তারেক রহমানকে দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ক্রমাগত ‘দুর্বল’ করার চেষ্টা করছেন নানাভাবে। এই উপায় সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন বিএনপির দলীয় একটি পত্রিকার প্রভাবশালী কর্তা ও কারাগারে আটক তারেক রহমানের একজন সহচর। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব দাবি করেছে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য,একাধিক উপদেষ্টা ও তিনজন প্রভাবশালী ভাইস-চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,আসন্ন মার্চে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভারমুক্ত হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত। তবে বিগত সময়ে মির্জার যে ভাবমূর্তি দলে ও দলের বাইরে গড়ে উঠেছে, সেটি কাউন্সিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে নেতা হিসেবে ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলে আরও বেশি শক্তিশালী ও প্রভাববিস্তারকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। এতে করে বিগত সময়ে তারেক রহমানদের সহচরদের ক্রেডিট দিয়ে বিএনপির নেতাদের রাজনীতি করতে হলেও মির্জা ফখরুল এ কাজটি করবেন না। এমনকি দলের অভ্যন্তরে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি চর্চা শুরু হলে বড় একটি মহল আর্থিক ও প্রভাবগত দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেই মনে করেন নেতারা। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই হাওয়াভবন সংশ্লিষ্টরা তারেক রহমানকে আগামী দিনে মির্জা ফখরুলের অবস্থান মনে করিয়ে দিয়ে এক ধরনের চাপে রাখতে চায়। এ কারণেই বিকল্প হিসেবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম সামনে আনা হচ্ছে বারবার। যদিও বাবু গয়েশ্বরের দাবি,‘তাকে মহাসচিব করা হলেও তিনি অপারগতা প্রকাশ করবেন। এই পদের জন্য তিনি কোনও লবিং করছেন না এবং এমন কোনও ইচ্ছাও তার নেই।’
সূত্রের দাবি, মির্জা ফখরুলের বিকল্প হিসেবে গয়েশ্বরকে সামনে আনার পেছনে প্রাক্তন হাওয়া ভবনের প্রভাবশালীরা কাজ করছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ইতোমধ্যে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর দলে গয়েশ্বরই সবচেয়ে বেশি মুখ খুলছেন এ নিয়ে। সূত্রগুলোর ধারণা,গয়েশ্বরের বক্তব্যের পেছনে হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন,বিএনপি একটি বড় দল, এই দলে মহাসচিব পদ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। এমননি প্রার্থীও থাকতে পারে একাধিক। গয়েশ্বর চন্দ্র এও বলেন, দলের মধ্যে বিভাজন, বিভেদ, অবিশ্বাস ঘটাতেই ঘরের মধ্যে অশান্তি তৈরি করতে চায় একটি পক্ষ।
বিএনপির চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘এটা সবাই জানে মির্জা ফখরুলই মহাসচিব হবেন। উনি তো ভদ্রলোক। উনাকে নিয়ে প্রশ্ন নেই।’
হাওয়া ভবনের নেপথ্যে থাকার বিষয়টি নিয়ে সরাসরি উড়িয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ভিসি। বলেন,‘হাওয়া ভবন নেই। এইটা নেই। এটার জন্য বিএনপির অনেক সাফার করতে হয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না, তো কিসের হাওয়া ভবন।’
জানতে চাইলে উল্টো প্রশ্ন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। বলেন,‘বিকল্প কে বলেন? উনার বিষয়ে দলে কোনও সমস্যা নেই।’
‘এখন পর্যন্ত উনার কথাই জানি’-এমন মন্তব্য করেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু। সমধর্মী মন্তব্য ছিল ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানেরও। তার মতে,‘তিনি তো দলে তার অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন।’
এসব বিষয়ে মোবাইলে প্রশ্ন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -‘এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য নেই’-বলে জানান। তিনি বলেন,‘ বিষয়গুলো স্পিকুলাস, কথা বলতে চাই না।’
বিএনপির দফতরের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের নামে ৮৪ টি মামলা হয়েছে। ২৪ টির চার্জশিট হয়েছে। ৭ বার গ্রেফতার হয়েছেন। ৬ বার জেল খেটেছেন। ১ বার হাজতবাসও করেছেন। দফতরের দায়িত্বশীল এ নেতা আরও জানান, এখন পর্যন্ত মির্জা ৩২২ দিন কারাবাসে থেকেছেন।
চেয়ারপারসনের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা দাবি করেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জটিলতা তৈরি করতে চান। তার আশেপাশে নিশ্চয় কোনও মহলের যুক্ততা রয়েছে। যে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দল এবং ম্যাডাম অবহিত আছেন তাকে নিয়ে বিতর্ক তোলার কোনও যুক্তি নেই।
তবে গয়েশ্বর চন্দ্র বলেন, কোনও লবিং করা গয়েশ্বরের ধর্ম না। যা বলি পরিস্কার করে বলি, সুস্পষ্ঠভাবে বলি। গত বুধবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার চেষ্টা হচ্ছে এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জেল থেকে চুক্তি করে বেরিয়েছেন-এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে? এ বিষয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, প্রথমত, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তো কাউকে ইন্ডিকেট করা হয়নি। আর আমি যদি জানি, যে মহাসচিব চুক্তি করেছেন, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে জানি। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, আমিই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, তাই না?
গয়েশ্বর মনে করেন, দল ভাঙার প্রক্রিয়া বা মহাসচিব নিয়ে তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে মিডিয়াতে, সেটি ষড়যন্ত্র। সামনের দিনে কাউন্সিলকে সামনে রেখে দল ভাঙার প্রক্রিয়া চলতেই পারে। দল ভাঙার প্রক্রিয়া সব আমলেই হয়েছে। গয়েশ্বর চন্দ্র আরও বলেন,আমি বুকটান করে বলতে পারি আজ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল সাহেবের বিরুদ্ধে ম্যাডামের কাছে কোনও অভিযোগ করিনি। তার সঙ্গে আজ অব্দি কোনও ঝামেলা হয়নি। তার আচরণে কষ্ট পেয়েও থাকি, তাহলে সেটাও তো বলিনি।
খালেদা জিয়ার উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ইনাম আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, মির্জা ফখরুলকে বাদ দেওয়ার কোনও কারণ দেখছি না। আর বাদ দেওয়া হলে সেটি হবে পুরোপুরি অস্বাভাবিক।
কাউন্সিলেই পরিস্কার হবে-এমন মন্তব্য সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়া হাসান জীবনের।
মির্জা ফখরুলকে ‘দুর্বল’ করার নেপথ্যে
এদিকে মির্জা ফখরুল ইসলামকে মহাসচিব হিসেবে দুর্বল করার পেছনে প্রাক্তন হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ বেরিয়ে এসেছে। দলীয় ও চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রে জানা গেছে,মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মহাসচিব হওয়ার বাধা তৈরি করার পেছনে কাজ করছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে মৃতুবরণ করা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী অনুসারীরা। বিগত দিনের রাজনৈতিক আদর্শে বাম হওয়ার কারণে মির্জা ফখরুল যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও তার অনুসারীদের অপছন্দের তালিকাতেই ছিলেন। ফলে, এই অংশটির তোপের মুখে পড়েছেন মির্জা।
সূত্রের দাবি, সাকা চৌধুরী না থাকলেও তার ভাই গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী এখনও বেঁচে আছেন। তার চিন্তা, চেতনা, বলয়, সিস্টেম এখনও বলবৎ রয়েছে। এই বলয়টি ঢাকায় মির্জা আব্বাসের কাঁধে ভর করেছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে মির্জা আব্বাস নিজেও চান ফখরুলই হোন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব। এ কথা তার কাছের লোকদের।নিজেকে বিতর্কে না জড়াতে নাম না প্রকাশের শর্তে এ কথা জানান সূত্রের দাবি, মির্জা আব্বাসের সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে বিএনপিতে প্রশ্ন নেই। কিন্তু যখন থেকেই গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মহানগর কমিটিতে যোগ দিয়েছেন, তখন থেকে ঢাকা মহানগর কমিটি কোমর সোজা করে দাঁড়াতেই পারেনি।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও থেকে সরাসরি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয় মির্জা ফখরুলকে। এটি করা হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী বিএনপির ইমেজঙ্কটের কারণে। তার ক্লিন ইমেজকে কাজে লাগাতেই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আনা হয়।
ক্লিন ইমেজ প্রসঙ্গে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, দলে তো একজন ক্লিন না। শুধু একজন ক্লিন বলে তো আপনারা মিডিয়া বাকিদের খাটো করছেন। এটা তো ঠিক না।
মির্জা ফখরুলের ঘনিষ্ঠ এক বিএনপি নেতা বলেন, মির্জা ফখরুল নিজে থেকে ঢাকায় আসেননি। তাকে আনা হয়েছে। আর তাকে মির্জা আব্বাস গ্রুপ পছন্দ না করার কারণ তাকে সাদেক হোসেন খোকার পক্ষের মনে করা হয়েছে। যদিও এ পর্যন্ত মির্জার বিরুদ্ধে একটিও গ্রুপিংয়ের অভিযোগ কেউ উঠাতে পারেনি।
এই ঘনিষ্ঠ নেতা আরও জানান, মির্জা ফখরুলের বিষয়ে তারেক রহমানের কাছে কানকথা লাগানো হচ্ছে। যদিও মির্জা তারেক রহমানের পছন্দের মানুষ। যুক্তি হিসেবে এই নেতা বলেন, তারেক রহমান দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলন করা হয় মির্জার এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে। তারেক রহমান তাকে নিয়ে চীন সফরে গেছেন।
এ নিয়ে কথা হয় বিএনপির একজন উপদেষ্টার সঙ্গে। নাম প্রকাশের শর্তে তিনি বলেন, ‘মির্জাকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কেউ নেই। কিন্তু তাকে দুর্বল করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।’ এই উপদেষ্টা আরও জানান,‘বিগত ৬৪ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট পেলেও তারা তাদের সাধারণ সম্পাদক কখনও মুসলমানের আর বিএনপি তো মেজরিটি মুসলমানদের পক্ষে। ফলে,গয়েশ্বর রায়ের মহাসচিব হওয়ার বিষয়টি কল্পনাপ্রসূত।’
জানা গেছে, কাউন্সিলের মাধ্যমে দলে ও দলের বাইরে জনপ্রিয় মির্জা ফখরুলকে ঠেকানো না গেলে গুলশান কার্যালয়ের দুই জনের ক্ষমতা হ্রাস পাবে। এ কারণে মির্জা ফখরুল এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন, তাতে গুলশান কার্যালয়ের দুই প্রভাবশালীর ক্ষমতায় ছেদ পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম মগহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকেও ফখরুলবিরোধী এবং মহাসচিব হতে আগ্রহী-হিসেবে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হলেও আদতে তিনি মির্জার উপকারও করেন না, অপকারও করেন না। দফতরের সঙ্গে মহাসচিবের দাফতরিক কাজের নানা ধরনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণে ইতোমধ্যে এই দুইনেতার মধ্যে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকও হয়েছে কিছুদিন আগে। এ নিয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে রিজভীর টেলিফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এসব বিষয়ে দুই দফায় ফোন করা হলেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 6 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ