রায় জমা নিতে বিচারপতি মানিকের চিঠি রায়ের সব ফাইল ফেরত দিতে বললেন প্রধান বিচারপতি

প্রকাশিত: 9:34 AM, February 8, 2016

প্রান্তডেস্ক: : অবসরে যাওয়া আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী রায় জমা দেয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। হাতে লেখা রায় ও আদেশ গ্রহণ করতে প্রধান বিচারপতিকে চতুর্থ দফায় এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর চিঠি প্রদানের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর কয়েক ঘন্টাপরই সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি কোনো লিখিত রায় বা আদেশ গ্রহণ করার জন্য জমা দেননি। গণমাধ্যমে কথা না বলে অনিষ্পন্ন সব রায়ের ফাইল বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ফেরত দেবেন, সেই প্রত্যাশা করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। একইসঙ্গে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলাকে নজীরবিহীন কলা হয়েছে।
গতকাল রোববার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে ‘মিডিয়াতে মামলার রায় ও আদেশ সংক্রান্ত কোনোরূপ বক্তব্য’ না দিয়ে তার (বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী) কাছে থাকা অনিষ্পত্তিকৃত রায়ের মামলার ফাইলগুলো ‘অতিসত্বর’ ফেরত দিতে বলা হয়েছে। সকালে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী চিঠিতে বলেন ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আপনাকে এই মর্মে অবহিত করছি যে, অবসরে যাওয়ার পর আমি কর্তৃক শুনানীকৃত ও লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল মামলার রায় ও আদেশ (যার সিংহভাগই ছিল লিভ পিটিশনের ওপর আদেশ) লেখার কাজ আমি ইতোমধ্যেই সমাপ্ত করেছি বিধায়, আমার হাতে লেখা রায় ও আদেশসমূহ গ্রহণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এতে বলা হয় আমার সাথে করা আচণ ন্যায়বিচার ও সংবিধান পরিপন্থী।
সুপ্রিম কোর্টের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে (গতকাল রোববার) সুপ্রিম কোর্টের বিচারকাজ চলাকালে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী একটি প্রেস কনফারেন্স করেন যা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির গোচরীভূত হয়। যদিও সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এ ধরণের প্রেস কনফারেন্স নজিরবিহীন। প্রধান বিচারপতি আশা করেন, বর্তমান ও ভবিষ্যতে মাননীয় বিচারপতিরা কোর্টের পবিত্রতা ও মর্যাদা বজায় রাখার স্বার্থে এরূপ কার্যক্রম হতে বিরত থাকবেন।
এই বক্তব্য প্রধান বিচারপতির গোচরে আসলে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করেন যে, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী তার কাছে লিখিত রায় কিংবা আদেশ গ্রহণ করার জন্য জমা দেননি।
সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি আশা করেন যে, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মিডিয়াতে মামলার রায় ও আদেশ সংক্রান্ত কোনোরূপ বক্তব্য না দিয়ে তার নিকট যতগুলো অনিষ্পত্তিকৃত রায়ের মামলার নথি রয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসে অতিসত্বর ফেরত প্রদান করবেন, যাতে বিচারপ্রার্থীদের আর ভোগান্তি না হয়।
এর আগে সকালে এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক অবসরের পর তার লেখা পূর্ণাঙ্গ রায় ও আদেশ গ্রহণ করতে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেন। তার দাবি এটি হলো প্রধান বিচারপতিকে দেয়া চতুর্থ দফা চিঠি যা গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতিকে পাঠিয়েছিলেন। ওই দিন চিঠিটি গ্রহণ না করায় গতকঅল রোববার সকালে আবার চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধান পরিপন্থী আচরণের অভিযোগ করেন তিনি।
চিঠিটি গ্রহণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সহকারী আনিসুর রহমান। এ বিষয়ে আনিসুর রহমান বলেন, প্রধান বিচারপতি বরাবরে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আমি প্রধান বিচারপতির পক্ষে গ্রহণ করেছি।
এর আগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ও ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতিকে দু’ দফায় চিঠি দেন শামসুদ্দিন চৌধুরী। পরে ১ অক্টোবর অবসরে যান তিন। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে প্রধান বিচারপতিকে তৃতীয় দফায় চিঠি দেন তিনি।
চতুর্থ চিঠিতে বলা হয়েছে, মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আপনাকে এই মর্মে অবহিত করছি যে, অবসরে যাওয়ার পর আমি কর্তৃক শুনানীকৃত ও লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল মামলার রায় ও আদেশ (যার সিংহভাগই ছিল লিভ পিটিশনের ওপর আদেশ) লেখার কাজ আমি ইতোমধ্যেই সমাপ্ত করেছি বিধায়, আমার হাতে লেখা রায় ও আদেশসমূহ গ্রহণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আমার প্রিসাইডিং জজ, মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে আমার লেখা সমাপ্ত হওয়া রায় ও আদেশগুলো গ্রহণ করার অনুরোধ করলে তিনি গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুসারে কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের লিখিত রায় ও আদেশ গ্রহণ করা যাচ্ছে না।
চিঠিতে শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি অবসরে যাওয়ার পর আপনি বৈষম্যমূলকভাবে আমার অফিস তালাবদ্ধ করেছেন, সকল অফিস স্টাফ ও সুবিধা থেকে আমাকে বঞ্চিত করায় আমি আমার হাতে লেখা রায়সমূহ টাইপ করতে পারি নাই। আমি ইতোপূর্বে আপনাকে অবহিত করেছি যে, আপনার এরূপ আচরণ সংবিধান ও আইন ও প্রথাবিরোধী ও একই সঙ্গে ন্যায়বিচার পরিপন্থী।
চিঠিতে আরো বলা হয়, কিছুদিন পূর্বে প্রদেয় আপনার বক্তব্য বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা অসাংবিধানিক’ এ বক্তব্যের ওপর ইতোমধ্যে মহান সংসদে আলোচনা হয়েছে এবং সংসদ আপনার বক্তব্যের সহিত দ্বিমত পোষণ করেছেন ও বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পর রায় লিখতে কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই এবং এটা অসাংবিধানিক নয় মর্মে মন্তব্য করেছেন। একই মন্তব্য করেছেন দেশের বিখ্যাত আইনজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। অপনার ব্যক্তিগত মতামত ও বিশ্বাসের জন্য আপনি বিচারব্যবস্থা আইন ও প্রথাকে অস্বীকার করতে পারেন না। কারণ আপনি সাংবিধানিক শপথ নিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি কর্তৃক হাতে লিখিত রায় ও আদেশসমূহ গ্রহণ করা ন্যায়বিচারের স্বার্থে একান্ত আবশ্যক। এ চিঠির অনুলিপি আইন মন্ত্রণালয় ও আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিদের কাছেও প্রেরণ করা হয়েছে।
অবসরে যাওয়ার সময় সাবেক এ বিচারপতির কাছে ১৯৬টি মামলার রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল। এমনকি হাইকোর্টে থাকাকালীন যেসব রায় দিয়েছিলেন, তার মধ্যেও কিছু রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল অবসরে যাওয়ার পরে। অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 9 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ