একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল সফলের তৎপরতা

প্রকাশিত: 8:10 AM, February 5, 2016

একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল সফলের তৎপরতা

loপ্রান্তডেস্ক: ভাষা আন্দোলনের শুরুতে সর্বস্তরের বাঙালিদের ‘জাগরণ’ প্রথম দৃশ্যপটে আসে সম্ভবত এই দিনটিতেই। বায়ান্নের ৫ ফেব্রুয়ারি ছিল অন্যরকম এক জাগরণের দিন। আগের দিনের মিছিল-সমাবেশ মানুষের মনে এই জাগরণ এনে দেয়। ৪ ফেব্রুয়ারি মিছিলে-সমাবেশে গোটা ঢাকা ছিল প্রতিবাদমুখর। ছাত্রদের মিছিলে মিছিলে ছেয়ে যায় ঢাকার পথঘাট। ছাত্রদের গড়ে তোলা ভাষা আন্দোলন মানুষের মনে নতুন রেখাপাত ঘটায়। এ দিনের পর ঢাকাবাসীসহ গোটা পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে।
এরপরের ঘটনাগুলো বলা যায় বেশ শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই এগোতে থাকে। নেতৃবৃন্দের মাথায় যোগ হয় একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল সফলের চিন্তা। ইতিমধ্যে ঘোষিত একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল কর্মসূচি সফল করতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যস্ত থাকেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শুরু হয় একুশের জোর প্রস্তুতি।
ভাষা সংগ্রামী আব্দুল মতিন তার স্মৃতিকথনে উল্লেখ করেন, ৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের সংবাদ পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ঢাকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এ দিন আন্দোলনের প্রতি অনেক বেশি সহমর্মিতা পোষণ করেন। স্কুল-কলেজে-অফিসে লোকের মুখে মুখে ছিল আগের দিনের মিছিল-সমাবেশের ঘটনা-গল্প। এ দিনের কর্মসূচি ছাত্রদের আরো সাহসী করে তোলে। ছাত্রনেতারা একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করতে বিপুল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে ছাত্র-সংযোগ প্রস্তুতি চলে। নতুন নতুন কর্মী ও উদ্যমী তরুণরা আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের সাফল্যে ছাত্র-যুব সংগঠনগুলোও পরিকল্পনা-কর্মসূচি গ্রহণ করে।
৫ ফেব্রুয়ারি নিখিল পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের জরুরি অধিবেশন বসে। ঐ অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনার কথা ঘোষণা করা হয়। (সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা, ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)।
ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক তার স্মৃতিকথনে লেখেন, ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সাফল্যের পর একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখেই চলে সকল কাজ। হরতাল, সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি যথাযথভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে থাকে। যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ একাধিক সংগঠন এ ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও নিষ্ক্রিয় থাকেনি। তবে একুশের কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রাবাসগুলো ছিল বিশেষভাবে তৎপর। একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিতে কলেজ ও স্কুলের ছাত্ররা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের ছাত্রনেতা- কর্মীদের এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের রাজনীতিমনস্ক ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায়। জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মৃণাল বারড়ি, আনিসুজ্জামান, আহমদ হোসেন ছিলেন অন্যতম।
৫ ফেব্রুয়ারি ডন পত্রিকায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে আন্দোলনের সমালোচনা করা হয়। `প্রাদেশিকতা` শিরোনামে ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, `প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বক্তব্য কায়েদে আজমেরই কথা। তার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের শত্রুদের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এটা জাতির পিতার প্রতি অবমাননা। প্রাদেশিকতার পক্ষে যারা কথা বলে তারা রাষ্ট্রের শত্রু। তারা রাষ্ট্রের বুনিয়াদ ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। তাদের কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেয়া অনুচিত।`
১৯৪৮ সালে আন্দোলনের গোড়ার দিকেই একে দাবিয়ে রাখতে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, `মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্যই এই আন্দোলন করা হইয়াছে। …উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে, অন্য কোনো ভাষা নহে। যে কেহ অন্যপথে চালিত হইবে সেই পাকিস্তানের শত্রু।` (দৈনিক আজাদ, ২৪ মার্চ, ১৯৪৮) জিন্নাহর এ কথারই প্রতিধ্বনি করা হয় ডনের সম্পাদকীয়তে।
সবকিছু ছাপিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জয়রথ এগিয়েই চলতে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 16 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ