স্বচ্ছ ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুপারিশসহ ৬ দফা শর্ত

প্রকাশিত: 8:46 AM, January 29, 2016

প্রান্ত ডেস্ক:পোশাক শিল্পে ইপিজেড এবং তার বাইরে কারখানাগুলোতে স্বচ্ছ ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুপারিশসহ ৬ দফা করণীয় শর্ত দিয়ে সাসটেইনেবল কম্প্যাক্টের দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভা বৃহস্পতিবার ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। বৈঠকে ভবন নিরাপত্তায় অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে কম্প্যাক্টের পক্ষগুলো পোশাক শিল্পের মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে একত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। এ বিষয়ে ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান সান্দ্রা গালিনা বলেন, ‘কম্প্যাক্ট এখনও জীবিত এবং এই ট্রেন এখনও চলমান।’
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অবশ্য বলেছেন, ইপিজেডে প্রায় ট্রেড ইউনিয়নের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠন করা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানি বলেছেন, ইপিজেডের বাইরে ও ভিতরে একই ধরনের সমান মানের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে হবে।
রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক শিল্পে ভবনের নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জেনেভায় বাংলাদেশ, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও আইএলও সাসটেইনেবল কম্প্যাক্ট নামের এই চুক্তি অনুমোদন করে। তারপর ২০১৪ সালে ব্রাসেলসে প্রথম পর্যালোচনা সভায় পোশাক শিল্পে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়েছে বলে মত প্রকাশের পাশাপাশি আরও অগ্রগতির প্রয়োজন বলে মতামত দেয়া হয়। এবারের দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভায় যে ছয়টি শর্ত দেয়া হয়েছে তার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনে স্বচ্ছতা আনয়নের প্রতি জোর দেয়া হয়।
দ্বিতীয় পর্যালোচনা বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ সমাপনী বিবৃতিতে যে ছয় দফা করণীয় শর্ত দেয়া হয়েছে সেগুলো হল : এক. সুষ্ঠু, দ্রুততার সঙ্গে, লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন দিতে হবে। দুই. অসুষ্ঠু শ্রম চর্চার সময়মতো ও স্বচ্ছ তদন্ত ও শাস্তি বিধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শ্রম ডাইরেক্টরেটকে অতিরিক্ত লোকবল ও সম্পদ দিয়ে উন্নয়ন করতে হবে যাতে শিল্প সম্পর্কে সম্প্রীতি বজায় থাকে। তিন. ইপিজেডে সমিতি করার স্বাধীনতা কালেকটিভ বার্গেইনিং রাইটস্ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত পরিবর্তন সাধন করে আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। আইএলও এবং সব অংশীদারকে নিয়ে এই আইনি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যা হবে জাতীয় শ্রম আইনের সমতুল্য। চার. বাংলাদেশ শ্রম আইন ও তার বিধি-বিধান কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা হতে হবে আইএলও কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অংশগ্রহণকারী কমিটি ও নিরাপত্তা কমিটির অংশগ্রহণের মাধ্যমে। পাঁচ. সাব কন্ট্রাক্ট কারখানাসহ দেশের রফতানিমুখী সব পোশাক কারখানা পরিদর্শনের লক্ষ্যে পরিদর্শক নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। ফলে পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারবেন। ছয়. সব পোশাক কারখানায় সংশোধিত অ্যাকশন প্ল্যান মোতাবেক ক্ষতিপূরণ ও স্বচ্ছ মনিটরিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করতে হবে। অংশীদারদের নিয়ে সময়মতো ও কার্যকরভাবে দাতাদের তহবিলের ব্যবহার করতে হবে। এই যৌথ সমাপনী বিবৃতিতে সবাই একমত হয়েছে।
কম্প্যাক্টের দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন পর্যায়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, শ্রম সচিব মিকাইল শিপার বক্তব্য রাখেন। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংশ্লিষ্ট দফতরের পরিচালক সান্দ্রা গালিনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানি, আইএলওর বিশেষ উপদেষ্টা ড্যান কুনিয়াহ এবং কানাডার হাইকমিশনার বিয়নেট পিয়ারে লাঘামে।
রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ওয়েস্টিন হোটেলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শুরু হয় বেলা আড়াইটায়। সন্ধ্যা ৬টার পরে এই বৈঠক শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, রানা প্লাজায় অভাবনীয় ধসের পর পোশাক শিল্পে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তারপর দুই বছর নয় মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এখন শ্রমিকরা খুবই খুশি। তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালু করা সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো কারখানার ৩০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদন করা হলে নতুন শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধনের অনুমতি দেয়া হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা আছে। ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়নের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন শ্রমিক কল্যাণ সমিতি করতে দেয়া হবে। ইপিজেডে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ নেই। কারণ সেখানে শ্রমিকের বেতন অনেক বেশি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রফতানি আয় বর্তমানে বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলার। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালে বাংলাদেশ পোশাক খাতেই বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করবে। তখন বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় দাঁড়াবে ৬০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার সহায়তা কামনা করেন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি পুনর্বহাল না করলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি ছয় বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান সান্দ্রা গালিনা বলেছেন, ২০০০ সালে ইইউ বাণিজ্য কমিশনার পাসকেল লামি বাংলাদেশকে অস্ত্র বাদে সব পণ্য শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে রফতানির সুযোগ দিয়েছিলেন। এ কারণে এখন এসব পণ্যের শ্রমমান ও নিরাপত্তার ইস্যু আমাদের দেখতে হচ্ছে। কম্প্যাক্টের মাধ্যমে আমরা উৎপাদক ও আমদানিকারক সবাই একত্রিত হয়েছি। নতুন করে কানাডার যোগদানের মাধ্যমে এটা প্রমাণ হয় যে, কম্প্যাক্ট এখনও বেঁচে আছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে। আমরা শ্রম আইনের সংস্কারকে উৎসাহিত করছি। এ সময় তিনি বলেন, ‘ট্রেনটি চলমান আছে।’ তিনি বলেন, কম্প্যাক্ট করায় পোশাক শিল্পে অনেক অগ্রগতি সাধিত হওয়ায় আমরা গর্বিত। কম্প্যাক্ট দীর্ঘমেয়াদে একত্রে কাজ করবে। কম্প্যাক্টের সবচেয়ে বড় অর্জন হল, সবার মানসিকতার মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল ডিলানি বলেন, এক অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা সবাই জানি আরও অনেক কিছু করতে হবে। এই কাজটি চ্যালেঞ্জিং। তবে এটা আমাদের করতে হবে। ভবনের নিরাপত্তায় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক অধিকারে ট্রেড ইউনিয়ন চালুতে আরও অগ্রগতি করতে হবে। আইএলও প্রতিনিধি ড্যান কুনিয়াহ বলেন, পোশাক শিল্পে লক্ষ্য করার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে এখনও অনেক ইস্যু আছে যেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। এসব ইস্যুর মধ্যে আছে শ্রমিক অধিকার, সমিতি করার স্বাধীনতা, ইপিজেডে কালেকটিভ বার্গেইনিং অ্যাসোসিয়েশন।
এফবিসিসিআই ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিউল ইসলাম বলেন, আমাদের কিছু দুর্বলতা আছে। সেগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে। সেটার আমরা উন্নতি করতে চাই। কিন্তু এখনও ৭০ শতাংশ ক্রেতা সস্তায় পণ্য কিনতে চায়। ক্রেতাদের সেখানে স্বাধীন পছন্দ রয়েছে। এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনটি অধিবেশনের সমাপনী অধিবেশন পরিচালনা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকারবিষয়ক অধিবেশন পরিচালনা করেন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার। ক্ষতিপূরণ ও মূল্য ইস্যু সংক্রান্ত অধিবেশন পরিচালনা করেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। এসব অধিবেশনে কারখানার শ্রমিক, মালিক, এনজিও প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, আইএলও, কানাডার প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করেন। সমাপনী বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড বিগত দিনে প্রায় দুই হাজার পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 8 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ