সংসদীয় কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষিত

প্রকাশিত: 8:44 AM, January 29, 2016

সংসদীয় কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষিত

1452232811প্রান্ত ডেস্ক:দুই বছরেও গতি পায়নি দশম জাতীয় সংসদ। সংসদীয় কর্মকাণ্ডও গতিহীন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়মিত অধিবেশন বসে; কিন্তু তাতে মন নেই অধিকাংশ সদস্যের। তারা ব্যস্ত থাকেন তদবির বাণিজ্য কিংবা আখের গোছাতে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও প্রায় একই হাল। এক মন্ত্রীর প্রশ্নের জবাব আরেক মন্ত্রী দিয়ে যান। অনেকাংশেই ‘প্রক্সি’ দিয়ে চলে প্রশ্নোত্তর পর্ব। উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে ‘ছায়া মন্ত্রণালয়’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলো। দুই বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ২২১টি সুপারিশের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ১৩টি। এ নিয়ে অধিবেশন চলাকালে সংসদীয় কমিটির একাধিক সভাপতি ক্ষোভ ঝেরেছেন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি। কার্যপ্রণালীবিধির আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা। সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবটিও ফাইলবন্দি হয়ে আছে। আর এ রকম বিবর্ণ চিত্র ধারণ করেই আজ দুই বছর পূর্ণ করছে দশম জাতীয় সংসদ।
বর্তমান সংসদের এই বাস্তবতার কথা অবশ্য মানতে নারাজ ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বি মিয়া। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদ অনেক বেশি গতিশীল এবং কার্যকর। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বর্তমান সংসদ বেরিয়ে এসেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক এবং বড় অর্জন।’ একই দাবি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আসম ফিরোজেরও। তিনি বলেন, ‘যে যাই বলুক, বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সংসদ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সংসদ এবং সংসদীয় কর্মকাণ্ডও এখন অনেক বেশি গতিশীল।’
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে এবারই প্রথম প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। দলটির কোনো কোনো সদস্য সমালোচনার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রশংসা করেই বেশি সময় কাটিয়েছেন। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরেও ক্ষোভ আছে। একাধারে বিরোধী দলে এবং সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকায় দলটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের একাধিকবার কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ বলেন, ‘আগে যারা সংসদে প্রধান বিরোধী দলে ছিলেন, তারা ফাইল ছোড়াছুড়ি নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতেন। সরকারের সমালোচনার পরিবর্তে নেতা-নেত্রীর নামে বিষোদ্গার করতেন। কোনো কোনো সদস্য কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বক্তৃতা দিতেন। এখন তা হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আমরা নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থাকি। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করি। খারাপ কাজেরও সমালোচনা করি। সংসদে এখন অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় বক্তৃতা হয় না।’
প্রধান বিরোধী দলের সদস্যরা তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে একবারই মাত্র ওয়াকআউট করেছে। এর বাইরে কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় কখনোই দেখা যায়নি তাদের। ১৯৯১ সাল থেকে দেশে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় দীর্ঘ ২৩ বছরের মাথায় এসে সংসদের বাইরে রয়ে যায় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সংসদে না থাকলেও গত দুই বছর ধরে সংসদ অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল তারাই। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়েই সংসদে বেশি আলোচনা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘বিএনপিকে নিয়ে, বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাতীয় সংসদে যেভাবে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য দেয়া হয় তা সত্যিই দুঃখজনক। এটি কার্যপ্রণালীবিধির সুস্পস্ট লংঘন।’
জানা গেছে, দুই বছরে ৩৮টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সম্পর্কিত আরও ১০টিসহ মোট ৪৮টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বাবদ ব্যয় করা হয়েছে ১০ কোটি টাকার বেশি। অথচ এসব বৈঠকের অধিকাংশ সুপারিশই থাকছে ফাইলবন্দি। এ নিয়ে কমিটির একাধিক সভাপতি সংসদ অধিবেশন চলাকালে এবং কমিটির বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নবম জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা বাড়াতে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটিগুলোর বৈঠক খাতে প্রতি বছর ব্যয় হয় ৫ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে বৈঠকে যোগ দিতে কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি ভাতা, যাতায়াত, আপ্যায়ন, সংসদীয় কমিটিগুলোর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে। এর বাইরে আরও রয়েছে অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে কমিটির সদস্যদের বিদেশ সফরের ব্যয়। বাস্তবে অভিজ্ঞতা কাজে না এলেও ব্যয়ের বহর প্রতিনিয়ত বাড়ছেই।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দবিরুল ইসলাম বলেন, ‘সংসদীয় কমিটিগুলো সার্বভৌম সংসদেরই অংশ। কোনো বিষয়ে কমিটি সুপারিশ করার অর্থই হচ্ছে এক ধরনের নির্দেশ। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের উচিত এ নির্দেশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া। কেউ তা না করলে তিনি সংসদ অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হবেন।’
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, ‘আইনগত এবং সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা নেই দাবি করে মন্ত্রণালয়গুলো সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ধার ধারছে না। অনেকে এসব সুপারিশ ও তলব প্রক্রিয়াকে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক বলেও আখ্যায়িত করেছেন। কেউ কেউ আবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। এর মধ্যেই বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি একের পর এক সুপারিশ করে যাচ্ছে। ফলে একদিকে দিন দিন সুপারিশের স্তূপ জমছে। অন্যদিকে সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় সংসদীয় কমিটিগুলোর অসন্তোষ বাড়ছে।’
জানা গেছে, জাতীয় এবং জনগুরুত্বপূর্ণ হলেও বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ দফতর-অধিদফতরের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের শাস্তির বদলে পুরস্কৃত করার খবরও পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক কর্মকাণ্ডের নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেখতে চেয়েছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাতে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে জাতীয় সংসদকে ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা’ বলায় টিআইবির নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্তঃবদলির সুপারিশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই সুপারিশও ফাইলবন্দি। হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে সুপারিশ করে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত কর্মকর্তাকেও তলব করে। হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও অনেক আসামি এখনও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাও সংসদীয় তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি। এ নিয়ে কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দুদক কর্মকর্তারা তাদের অবস্থানে অনড়।

সূত্র জানায়, গত দুই বছরে এ রকম ২২১টি সুপারিশ করেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এছাড়া তারা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ২৮টি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এসব কমিটি ঘটনা খতিয়ে দেখার পর অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে প্রতিবেদনও দেয়। কিন্তু দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ক্রেস্টে সোনা কম দেয়ার বহুল আলোচিত ঘটনা তদন্ত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তারা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু ওই সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সংসদে জনগণের সমস্যা নিয়ে কথা হয় না। সেখানে ব্যক্তির গুণকীর্তন চলে।’
আরেক বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, ‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না।’ সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কমিটিগুলো শক্তিশালী হলে দুর্নীতি কমবে। মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।’ সুপারিশ মানার বিষয়টি বাধ্যতামূলক না হওয়ায় মন্ত্রণালয়গুলো সংসদীয় কমিটির কথাবার্তা আমলে নিচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দশম জাতীয় সংসদ গঠনের পর থেকেই অধিবেশন চলছে ঢিমেতালে। চলছে কোরাম সংকট এবং রীতি ভঙ্গের প্রতিযোগিতা। অধিবেশন কক্ষে বসে সদস্যরা খোশগল্পে মেতে থাকেন। মোবাইল ফোনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলেন। নিজের আসন ছেড়ে অন্যের আসনে গিয়ে বসে থাকেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বি মিয়া এ নিয়ে বারবার তাদের সতর্ক করলেও কেউ তা আমলে নেননি।
বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৯ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে দশম জাতীয় সংসদ। ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। প্রথম দিনেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত করা হয় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। রীতি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনেই গঠন করা হয় সবক’টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। দশম জাতীয় সংসদেই প্রথমবারের মতো ৪০ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ। সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনে উদ্বোধনী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে যাত্রার পর আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বাইরে প্রথমবারের মতো তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। তবে বিএনপির মতোই জাতীয় পার্টিও এখন পর্যন্ত বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচিত করতে পারেনি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার খেসারত দিতে গিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর পর সংসদের বাইরে ছিটকে পড়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। এবারই প্রথম বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় পার্টির তিন সংসদ সদস্য সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।
জাতীয় পার্টির ৪০ জন সদস্য ছাড়াও দশম জাতীয় সংসদে শাসক দল আওয়ামী লীগের রয়েছে ২৭৬ জন সদস্য। এর মধ্যে দল এবং মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর টাঙ্গাইল-৮ আসনের সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় তাদের একটি আসন কমে গেছে। আইনি জটিলতার কারণে এ আসনের উপনির্বাচনও আটকে আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ময়মনসিংহ-৭ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এমএ হান্নান আটক রয়েছেন। এছাড়াও দশম জাতীয় সংসদে ওয়ার্কার্স পার্টির ৭ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের ৬ জন, জাতীয় পার্টি-জেপির ২ জন, তরিকত ফেডারেশনের ২ জন এবং বিএনএফের ১ জন সদস্য রয়েছেন। স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন ১৬ জন।
সংসদ সদস্যদের মধ্যে এবার ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন। আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়েছে। নবম জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৭টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং এলডিপিকে ছেড়ে দিলেও এবার বিরোধী দলগুলোকে দিয়েছে মাত্র একটি। দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে করা হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।
বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করায় প্রথম থেকেই এই সংসদ নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। দেশ-বিদেশেও এ নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে। এত সমালোচনা সত্ত্বেও দশম জাতীয় সংসদেই অর্জিত হয় দুটি বড় অর্জন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এছাড়াও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সাবের হোসেন চৌধুরী মঙ্গলবার জাতিসংঘ মহাসচিবের নারী, শিশু, কিশোর ও স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য নির্বাচিত হন। সম্প্রতি ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভায় হিউম্যান রাইটস কমিটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের আরেক সংসদ সদস্য এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী।
দশম জাতীয় সংসদের বিগত আটটি অধিবেশনের ১৬৮ কার্যদিবসে ৪৮টি বিল পাস হয়েছে। বর্তমানে সংসদের নবম অধিবেশন চলেছে। ২০ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ অধিবেশনে মঙ্গলবার পর্যন্ত আরও একটি বিল পাস হয়। বুধবার পর্যন্ত এ অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৬টি। আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালের চারটি অধিবেশন চলে ৮৫ কার্যদিবস। ওই সময়ের মধ্যে ২৯টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান রেখে বিল পাস।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 12 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ