মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসার নিষেধাজ্ঞায় নতুন মাত্রা!

প্রকাশিত: 5:59 AM, January 19, 2016

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসার নিষেধাজ্ঞায় নতুন মাত্রা!

zoni10-300x158প্রান্ত ডেস্ক:সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ভিসা-নিষেধাজ্ঞা আবারো জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনিতে গত ৩/৪ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের উপর ভিসা-নিষেধাজ্ঞা বলবত্ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবিষয়ে জোর প্রচেষ্টা চালানোর পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল; কিন্তু প্রবাসী বাঙালিরা দেশে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বিমানে ও জাহাজে ব্যাগেজ রুলে প্রেরিত পণ্য যথাসময়ে গন্তব্যে না পৌঁছায় ক্ষুব্ধ হয়ে পণ্য পাঠানোর দায়িত্ব নেয়া ব্যাগেজ-ফরোয়ার্ডারদের বা এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করায় পরিস্থিতি জটিল রূপ নিয়েছে। এজেন্টদের অনেকেই ব্যাগেজ রুলে পণ্য পাঠানোর কাজ ফেলে সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরে এসেছে। অনেকে সেখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ব্যাগেজ রুলে প্রবাসীদের পরিবারের কাছে পাঠানো পণ্যের ব্যাপারে চট্টগ্রামে কাস্টমস হাউস কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বেশকিছু আপত্তি উত্থাপন করলে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে গত প্রায় আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে পণ্য ছাড় করানো সম্ভব হচ্ছে না। টিনজাত দুধ, শিশু ও বড়দের কাপড়-চোপড়, চকোলেট, গৃহস্থালি ও পারিবারিক ব্যবহার্য সামগ্রী প্রেরিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। কাস্টমসের আপত্তির মুখে পণ্য ছাড় না হওয়ায় বিমান বন্দরের গুদামে প্রায় ৫০০ টন পণ্য জমে উঠেছে। বহু খাদ্য সামগ্রীর মেয়াদ-উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কার্গো ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো. আলম তৌহিদ ইত্তেফাককে বলেন, প্রবাসী বাঙালিদের নানা অনিয়মের কারণে আমিরাতে গত ৩/৪ বছর বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদান বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো সম্প্রতি; কিন্তু ব্যাগেজ রুলে পণ্য প্রেরণকারী ফরোয়ার্ডাদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রবাসীরা সম্প্রতি সেদেশে মামলা করলে পরিস্থিতি আবারো জটিল হয়ে উঠে। তিনি বলেন, ব্যাগেজ রুলে প্রবাসীরা যে টিনজাত দুধ পরিবার-পরিজনদের জন্য পাঠায়, তা অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয়। বাংলাদেশে সেই দুধ অনেক কম দামে কিনতে পাওয়া যায়। কাজেই অতিরিক্ত দামে কেনা দুধ বা অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী ব্যবসা করার জন্য দেশে পঠানোর অভিযোগ যুক্তিযুক্ত নয়। ব্যাগেজ রুলে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে বিভিন্ন সামগ্রী পাঠানোর মাধ্যমে প্রবাসীদের সাথে তাদের পরিবারের আনন্দ ও আবেগের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। আগে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছিলো তখন ব্যাগেজ রুলে সামগ্রী পাঠানো শুরু হয়। বর্তমানে যখন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মজীবী প্রবাসীর সংখ্যা ৫০ লাখ, তখন প্রেরিত সামগ্রীর পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে মাথাপিছু বাড়ছে।
তিনি বলেন, একজন প্রবাসী বিভিন্ন পণ্য কি পরিমাণ পাঠাতে পারবেন ব্যাগেজ রুলে তা অস্পষ্ট। আবার একজন দেশে আসা প্রবাসীকে অনেক সময় তার পরিচিত প্রবাসীদের প্রেরিত সামগ্রী একই ব্যাগেজে একসাথে আনতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাগেজ রুলে থাকা ‘যৌক্তিক পরিমাণ’ শব্দটির অপব্যাখ্যা করে এসব পণ্য ছাড়ে জটিলতা তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, প্রবাসীদের কাছে তাদের প্রবাসের চাকরিটাই মুখ্য। যেসব সামগ্রী তারা পরিবার-পরিজনকে পাঠান তা উপহারমাত্র। তাদেরই ঘামে-শ্রমে দেশে আজ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীরা প্রণোদনা চান না, তারা চান তাদের প্রেরিত সামগ্রী স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছুক। তিনি জানান, ব্যাগেজ রুল সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে আর আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন। একসময় বাঙালিরা ব্যাগেজ রুলের সামগ্রী পাকিস্তানি-ভারতীয় এজেন্টদের মাধ্যমে পাঠাতেন। পরে কিছু বাঙালি নামমাত্র সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে একাজটিতে এসে অনেক বাঙালির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। বর্তমানে এসব এজেন্ট মামলার শিকার হয়ে চরম দুরবস্থার শিকার হয়েছেন, যা সেখানে বাঙালিদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। ইতিমধ্যে শারজাহ ও দুবাইতে ব্যাগেজ ফরোয়ার্ডার বা এজেন্টদের কার্গো লাইসেন্স প্রদানও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মামলার শিকার হয়ে হয়রানি এড়াতে দেশে চলে আসা ব্যাগেজ রুল পণ্য প্রেরণকারী এজেন্ট জাহাঙ্গীর ‘ইত্তেফাক’কে জানান, আবুধাবিতে তারা ৮০ জন গত চার বছরে সেখানকার লাইসেন্স নিয়ে ৮০টি সংস্থার মাধ্যমে এই সার্ভিসে নামে। তারা এই কাজের মাধ্যমে ৩২০ জন বাঙালির চাকরির সংস্থান করেছিলেন। চট্টগ্রাম বিমান বন্দর ও সমুদ্র বন্দরে পণ্য আটকে যাওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ বাঙালি প্রবাসীদের মামলার শিকার হন। এখন সব হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা ব্যাগেজ রুলকে আরো সুস্পষ্ট করে তুলুন। আইনের অস্পষ্টতার কারণে যে জটিলতা তা বহু মানুষের সর্বনাশের কারণ হয়েছে। প্রবাসীরা বাংলাদেশের কাস্টমস জটিলতার প্রতিও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তারা বলছেন, প্রয়োজনে কাস্টমস কর্মকর্তারা ব্যাগেজ খুলে দেখুন।
চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে কর্মরত সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধিরা ইত্তেফাককে বলেন, প্রবাসীরা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে কি পরিমাণ সামগ্রী পাঠাতে পারবে, ব্যাগেজ রুলে তা স্পষ্ট করে বলা নেই। বলা আছে ‘যৌক্তিক পরিমাণ’। যার পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি সেতো তুলনামূলকভাবে বেশি পাঠাবেই। কাস্টমস কর্মকর্তারা ঢালাওভাবে মনগড়া আপত্তি না তুলে ব্যাগেজ রুলে পরিমাণটা স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে পারেন। এতে প্রবাসীরা, এজেন্টরা, প্রবাসীদের আত্মীয়-স্বজন উপকৃত হবেন। এদিকে আটক করা চকোলেট, বিস্কুট ইত্যাদি পণ্য বন্দরের গুদামে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এজেন্টদের ডেমারেজ আসছে ৭ থেকে ৮ লক্ষ টাকা। এভাবে চললে একাজ করতে আসা প্রবাসীরাও দেউলিয়া হয়ে যাবে।
কাস্টমস হাউসের সূত্রগুলো জানায় যে, প্রবাসীরা ব্যাগেজ রুলে যুক্তিসংগত পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য, পরিধেয়, গৃহস্থালী অথবা অন্যান্য সামগ্রী আনতে পারবেন। তবে পরিমাণটা কতো তা তারা স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি। কারো মতে সর্বোচ্চ ১০০ কেজি। অন্যদিকে কাস্টমস সূত্রগুলো ব্যাগেজ রুল পণ্য প্রেরণ ও ছাড়করণের সাথে জড়িতদের সম্পর্কে নানা অভিযোগ করেন। এক্ষেত্রে তারা একটি মুদ্রা পাচার ঘটনা ধরা পড়ার কথাও বলেন।
চট্টগ্রামের কয়েকটি ব্যবসায়ী সূত্রমতে, কাস্টমস হাউসকে ব্যবসায়ী ও জনবান্ধব হওয়া উচিত। আইন ও বিধির নামে জটিলতা সৃষ্টি করলে একদিকে জনদুর্ভোগ যেমনি বাড়ে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব হারায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 6 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ