জেএমবির ‘হামলাকারী’ দলের ছয় নেতা এখনো পলাতক

প্রকাশিত: 10:25 AM, January 17, 2016

জেএমবির ‘হামলাকারী’ দলের ছয় নেতা এখনো পলাতক

poপ্রান্তডেস্ক:জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তৃতীয় সারির একটি দল সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে হত্যা ও নাশকতার অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটিয়েছে। জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শের এই দলটি জেএমবির কারাবন্দি আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের বিরোধী। সাম্প্রতিক সময়ে হোসেনী দালানে বোমা হামলা, পুলিশ হত্যা, রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যা, মন্দিরে ও মসজিদে হামলাসহ কয়েকটি ঘটনায় এই দলের অনুসারীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গোপনে সংগঠিত হয়ে হামলা চালানো দলটি এখন নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে এখনো অন্তত ছয়জন নেতা পলাতক আছে, যারা ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত। এই নেতাদের হাতেই জেএমবির পরবর্তী নেতৃত্ব যেতে পারে বলেও ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেএমবির সাংগঠনিক কোনো কাঠামো নেই। তবে তারা ছোট দলে ভাগ হয়ে গোপনে বৈঠক করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল শনিবার বলেন, “জেএমবির ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির পর এখন ‘সি’ ক্যাটাগরির নেতারা সক্রিয়। তাদেরই একটি গ্রুপ সাম্প্রতিক সময়ের অন্তত ২০টি হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ সদস্যই গ্রেপ্তার হয়েছে। হামলাকারী দলের পাঁচ-ছয়জন নেতা গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছে। এতে তাদের নেতৃত্ব ভেঙে গেছে।” জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন করে সংগঠন গোছানোর চেষ্টা করা দলটি ঢাকা, উত্তরাঞ্চল ও চট্টগ্রামে কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে। তাদের মধ্যে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনাকারী একটি দল ঢাকায় সক্রিয়। এই দলে কয়েকজন মাঝারি ধরনের নেতা রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার ফারদিন ওরফে সজল, সংগঠক শাকিল ওরফে মোস্তাক, ঢাকা দক্ষিণের কমান্ডার পিয়াস, আরেক কমান্ডার সজীব, তারেক ও রিপন আছে। মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, কয়েকজন পালিয়ে আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে শাকিলের ব্যাপারে তথ্য মিলছে না। জানা গেছে, মিরপুরের আস্তানার খবর ফাঁস হওয়ায় ডিবির অভিযানের ঘটনায় এবং নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের সামরিক কমান্ডার কামাল ওরফে হীরনের সঙ্গে শাকিলের বিরোধ চলছিল। জিজ্ঞাসাবাদে জেএমবির সদস্যরা বলছে, প্রতিপক্ষ দলটি হয়তো শাকিলকে মেরে ফেলেছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে আরমান, জাহিদ হাসান রানা ওরফে মুসহাব এবং নুর মোহাম্মদ ওরফে ল্যাংড়া মাস্টার নামে তিন জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ওই রাতেই হাজারীবাগে অভিযান চালানোর সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন নিহত হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের নির্দেশে ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা হামলা চালিয়ে দুজন হত্যা এবং গাবতলী ও আশুলিয়ায় দুই পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬ জেএমবি সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে তিন সামরিক নেতা ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে আরো আট জেএমবি অনুসারী। গত বুধবার রাতে হাজারীবাগে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জেএমবির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডার কামাল ওরফে হীরন ও ঢাকা উত্তরের সামরিক কমান্ডার আবদুল্লাহ আল নোমান নিহত হয়। এর আগে ২৫ নভেম্বর রাজধানীর গাবতলীতে নিহত হয় ওই সময়ের সামরিক কমান্ডার শাহাদত ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা। তার মৃত্যুর পর দায়িত্ব নিয়েছিল হীরন। তিন নেতা ছাড়াও গত তিন মাসে তিনজন পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। চারজনের লাশই ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে পড়ে আছে। এখন নেতৃত্বে থাকা নেতাদের মধ্যে সংগঠনের সামনের সারির কেউ অবশিষ্ট নেই। তবে একই গ্রুপের পলাতক কয়েকজন সংগঠনের পরবর্তী নেতৃত্বে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। গোপনে সংগঠিত হয়ে বড় হামলা চালানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি জেএমবির নেই বলেই মত সংশ্লিষ্টদের। গোয়েন্দারা বলছেন, জেএমবি এখনো গোপনে বৈঠক ও যোগাযোগ করছে বলে তথ্য মিলেছে। পলাতক নেতারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। তারা নির্দিষ্ট মসজিদ বা এলাকায় বৈঠক করছে। তাদের কাছে কয়েকটি মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল আছে। উত্তরাঞ্চলে একটি মাইক্রোবাসও ব্যবহার করছে জেএমবির সদস্যরা। জেএমবির নাশকতাকারী দলটি বড় হামলা চালিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল। গ্রেপ্তারকৃতরা বলছে, নোমান বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন দখল করে কিছু সময়ের জন্য সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিল। এই পরিকল্পনা সে তার সহযোগীদের জানিয়েছিল। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জেএমবির আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্ব না মেনে সংগঠনের একটি অংশ আলাদা হয়ে যায়। কয়েকজন নেতা ভারতে পালিয়ে আছে। বিছিন্ন হওয়া দলটিই সম্প্রতি হত্যা ও নাশকতা করছে। তারা গোপন আস্তানায় হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেয়। হোসেনী দালানে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল হীরন, শাহাদত ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা, আরমান, জাহিদ হাসান রানা ওরফে মুসহাব, সালমান, আশিক, মাসুদ ও সজীব। গাবতলীতে পুলিশ চেকপোস্টে হামলার ঘটনায়ও হীরন, সজীব ও বগুড়ার সাবেক শিবির নেতা এনামুল জড়িত। ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় মাসুদ রানা নামের আরেক জঙ্গিকে। আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় হীরনের সঙ্গে ছিল হোজ্জা ও তারেক। হোজ্জা মোটরসাইকেল চালায় এবং হীরন কুপিয়ে হত্যা করে। তারেক বোমা ফাটায়। এ ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি গত বুধবার রাতে হাজারীবাগের অভিযানের সময় জব্দ করে ডিবি পুলিশ। হামলার ঘটনায় সরাসরি জড়িতদের মধ্যে সজীব, মাসুদ ও তারেক এখনো পলাতক। আবদুল্লাহ ওরফে নোমান ছিল এই দলের প্রশিক্ষক। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, আমির সাইদুর রহমানের বিরোধী পক্ষটির সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। পলাতক নেতাদের মধ্যে শাকিল, ফারদিন, পিয়াস, সজীব, তারেক ও রিপন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তারাই জেএমবির এই ‘হত্যাকারী’ দলের নেতৃত্বে চলে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। সূত্র জানায়, মিরপুরের আস্তানাটিতে হীরন ও শাকিলের যাতায়াত ছিল। পুলিশের অভিযানের সময় শাকিল ও হীরন পালিয়ে যায়। পরে তাদের মধ্যে সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য ও অবিশ্বাস দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় জেএমবির একটি অংশ শাকিলের ওপর ক্ষিপ্ত রয়েছে। তারা শাকিলকে হত্যাও করে থাকতে পারে। সূত্র জানায়, রাজধানী ও আশপাশে জেএমবি সদস্যরা অন্তত ১৪টি বাসা ভাড়া নিয়ে গোপনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাসা বদল হলেই সদস্যদের নামও পাল্টে ফেলা হতো। তবে জেএমবির সক্রিয় অংশটির বেশির ভাগ সদস্যের বাড়ি ও কর্মকাণ্ড উত্তরাঞ্চলে। এ কারণে তারা উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের তত্পরতার বিষয়ে ভারতীয় গোয়েন্দারাও বাংলাদেশকে তথ্য দিয়েছিল।

সৌজন্যে:কালেরকণ্ঠ

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 4 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ