মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব

প্রকাশিত: 5:36 AM, January 13, 2016

মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব

sssপ্রান্তডেস্ক: এমন তাণ্ডব আর দেখেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী। ইজিবাইক ভাড়া দেওয়ার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষে ?এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় শহরজুড়ে চালানো হয় ধ্বংসযজ্ঞ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে দিনভর ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার, জেলা আওয়ামী লীগ, প্রশিকা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্থানীয় সংসদ সদস্যের কার্যালয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত সরোদ, বাংলা ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ছবি। মাদ্রাসাছাত্রদের অবরোধের কারণে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালীর ট্রেন চলাচল করতে পারেনি। সারাদিন শহরের সব দোকানপাট বন্ধ ছিল। কার্যত শহরের মানুষ গৃহবন্দি হয়ে কাটিয়েছে দিনটি। এর মধ্যে আজ আবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকলেও গত রাত ৯টায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের বৈঠকের পর তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
এর আগের দিন সোমবার রাতের সংঘর্ষে ২৫ পুলিশসহ উভয় পক্ষের শতাধিক লোক আহত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে অর্ধশতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। পুলিশ ৫০৬ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৭৬ রাউন্ড টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গতকাল তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ১২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নজরুল ইসলাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শহরে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করেছেন বলে জানান। পুলিশের এআইজি মো. মনিরুজ্জামান জানান, এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার এএসপি তাপস রঞ্জন ঘোষ ও ওসি আকুল চন্দ্র বিশ্বাসকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রামে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রামের ডিআইজি মো. মাহবুবুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার বিকেলে ইজিবাইকের ভাড়া দেওয়া নিয়ে শুরু হয় এ ঘটনা। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শহরের জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় একজন বয়স্ক ইজিবাইকচালকের সঙ্গে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মার্কেটের বিজয় টেলিকমের মালিক রনি আহমেদ বিষয়টি সমাধান করতে এগিয়ে আসেন। এ সময় ওই ছাত্রের সঙ্গে রনির কথাকাটাকাটি হয়। এ ঘটনার জের ধরে মাদ্রাসার একদল ছাত্র সন্ধ্যা ৭টার দিকে মার্কেটে এসে হামলা চালায়। তারা বিজয় টেলিকমসহ ছয়টি দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করে। হামলায় ব্যবসায়ী রনি গুরুতর আহত হন। এর পর ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে মাদ্রাসার ছাত্রদের ধাওয়া দেন। এতে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী-সমর্থক ব্যবসায়ীদের পক্ষ হয়ে মাঠে নামলে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুনরায় মাদ্রাসা রোডে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে সংঘর্ষ।
আহত মাদ্রাসাছাত্র হাফেজ মাসুদুর রহমান (২০) রাত পৌনে ৩টায় মারা যান। মাসুদুরের মৃত্যুর খবর সকালে ছড়িয়ে পড়লে ওই মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মাসুদুর শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার কিতাবখানার ছামেন শ্রেণীর (অষ্টম শ্রেণী) ছাত্র এবং নবীনগরের সেমন্তঘর এলাকার হাফেজ মৃত ইলিয়াছ মিয়ার ছেলে। তিনি পৌর এলাকার ভাদুঘরে থাকতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা মাইনুল হক সকালে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে মাসুদুরকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তার বুকে ও কোমরের নিচে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাইনুল হক বলেন, ‘মাদ্রাসার অন্য ছাত্রদের ভাষ্য অনুযায়ী সোমবারের সংঘর্ষে ওই ছাত্র আহত হন। ছাত্ররা আমাকে জানিয়েছেন, তারা মাসুদুরকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেন। পরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে আনা হয়।’
াসুদুরের মৃত্যুর ঘটনা মাদ্রাসায় পৌঁছতেই ছাত্ররা ছুটে যায় রেলস্টেশনে। রেললাইন অবরোধ করে তারা স্টেশনের কন্ট্রোল রুমে ব্যাপক ভাংচুর করে। তারা স্টেশনের সুইচ বোর্ড ও সিগন্যাল প্যানেল ভেঙে ফেলে; তুলে ফেলে রেললাইনের স্লিপার। কাঠের গুঁড়ি দিয়ে রেললাইন অবরোধ করে এবং আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের অবরোধের কারণে ঢাকার সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় রেলের চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাসুদুরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসার ছাত্ররা শহরের রেলগেট এলাকা, জেলা পরিষদ মার্কেট, কালীবাড়ি মোড়, টিএ রোড, ঘোড়াপট্টির মোড়, ফকিরাপুল, মঠের গোড়া, পুরাতন কাচারী পুকুরপাড়, কুমারশীল মোড়সহ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শহরের মঠের গোড়া এলাকায় টায়ারে আগুন ধরিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়। মাদ্রাসাছাত্রদের অবস্থানের কারণে সংশ্লিষ্ট সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সব ধরনের পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। শহরের ফকিরাপুলের ওপর বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে সদর থানা পুলিশকে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সকাল থেকে শহরে পুলিশ ও র?্যাবের সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। শহরে মোতায়েন করা হয় বিজিবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 9 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ