বাংলাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিত: 2:16 AM, February 2, 2016

বাংলাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

রু হলো বাঙালির প্রাণের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যকালে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ধ্রুপদী সম্ভার বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে আরও ব্যাপকভিত্তিক ও মানসম্মত অনুবাদের জন্য বাংলাদেশি লেখক-প্রকাশকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তৃণমূলের গণমানুষের জীবন ও সংগ্রাম সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখকদের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। গতকাল ‘অমর একুশে অনুষ্ঠানমালা ও ২০১৬ উদ্বোধন-অনুষ্ঠান’র শুরুতে জাতীয় সংগীত, পবিত্র কোরআন, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা আন্দোলনে অমর শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব বেগম আকতারী মমতাজ, চেক প্রজাতন্ত্রের লেখক গবেষক রিবেক মার্টিন, বৃটিশ কবি ও জীবনানন্দের অনুবাদক জো উইন্টার, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সমিতির সভাপতি রিচার্ড ড্যানিস পল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
বক্তব্যের শুরুতে সকল ভাষাশহীদ ও ভাষা সংগ্রামীদের স্মরণ করেন তিনি। এ সময় মহান ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর ও পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু, ভাষা শহীদ ও ভাষা সংগ্রামীদের অবদানের বিষয়টি স্মরণ করে তিনি বলেন, বাঙালি জাতি কোনোদিন মাথানত করেনি। বাঙালি যুগে যুগে আন্দোলন-সংগ্রাম করে বুকের রক্ত দিয়ে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা আরও অনেকেই শহীদ হন। এই আঘাত শুধু অন্দোলনকারীদের ওপরই ছিল না। এটি ছিল বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতির ওপর আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে শিক্ষা আন্দোলন, ছয়-দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা দেয়। পথ দেখায়। একুশ মানে মাথা নত না করা।
২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের বিষয়টি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বিশ্বের দরবারে এ ভাষার গৌরব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমি নিজেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে আসছি। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালাম নামের দুজন প্রবাসী বাঙালির প্রচেষ্টা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আমি স্মরণ করছি।  [the_ad id=”253″]
বাংলা একাডেমির বিকাশ ও উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বিবরণ  দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভাষা আন্দোলনের ফসল হিসেবে তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের ২১ দফার ১৬ নম্বর দফার বাস্তবায়ন হিসেবে ১৯৫৫ সালে গড়ে উঠে বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষের বাতিঘর-বাংলা একাডেমি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলা একাডেমি আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় ও পবিত্র প্রাঙ্গণ। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর দর্শনে আমরা যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা-ভাবনার কেন্দ্রে রেখেছি সাধারণ মানুষের মুক্তির বিষয়টি, তেমনি বাংলা একডেমি সার্বিক উন্নয়নেও আমরা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছি। যখনি সরকারে এসেছি বাংলা একাডেমিকে কিভাবে আরও উন্নততর করা যায় সেই চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা তার যাত্রা শুরুর তিন দশক পেরিয়ে এখন বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপী  গ্রন্থমেলার স্বীকৃতি পেয়েছে। এ গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এমনকি বহির্বিশ্বে বসবাসরত বাঙালিদের বিপুল সমাগম ঘটে। এই মেলা এখন বৃহত্তর বাঙালির প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে।
বইমেলার প্রতি নিজের আকর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তখন আমার বান্ধবী (মরহুমা) বেবী মওদুদকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আসতাম। এখানে এলে আমার খুব ভালো লাগে। এখন অনেক নিয়মে বন্দি থাকতে হয়। আবার কবে বইমেলায় আসবো, ঘুরে বেড়াবো-আমি সেই অপেক্ষায় আছি। তিনি বলেন, এক মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা-পৃথিবীর কোথাও এরকম হয় কিনা- আমার জানা নেই। কিন্তু মনে হয়, এক মাসেও মন ভরে না। মনে হয় বইমেলা আরও কিছুদিন থাকুক।
বইমেলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা একাডেমির ব্রেইল প্রকাশনার প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, আজ (গতকাল) বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনীগ্রন্থ (বঙ্গবন্ধুর বীরত্বগাথা) দিয়ে বাংলা একাডেমির ব্রেইল প্রকাশনার শুভযাত্রা হলো। যে মানুষটি দেশের সকল শ্রেণির মানুষের মুক্তির জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমরা তারই প্রদর্শিত পথে দেশের সুবিধাবঞ্চিত শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভাইবোনেরা যেন বাংলা ভাষা-সাহিত্য এবং বাঙালির গৌরবময় ইতিহাসগাথা তাদের ভাষায় সহজে বুঝতে ও পড়তে পারে, সেজন্য বাংলা একাডেমির ব্রেইল প্রকাশনা বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আমি আশা করি, এই প্রকাশনাধারা অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে আমাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলির ব্রেইল সংস্করণ প্রকাশিত হবে।
বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর গ্রন্থমেলার অনুষ্ঠানে আমি বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের ওপর জোর দিয়েছি। এ বছর বাংলা একাডেমি থেকে বাংলা সাহিত্যের মীর মশাররফ হোসেনের অমর উপন্যাস ‘বিষাদসিন্ধু’র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আমাদের ধ্রুপদী ও সামপ্রতিক সাহিত্যের সুনির্বাচিত সম্ভার বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে আরও ব্যাপকভিত্তিক ও মানসম্পন্ন অনুবাদের জন্য লেখক-প্রকাশকদের আহ্বান জানাই। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একুশে গ্রন্থমেলার মঞ্চে দেশের বাইরে বিদেশি লেখক-পণ্ডিতদের সমাগম হচ্ছে। তাদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলার সমৃদ্ধ ভাষা-সাহিত্য বার্তা যেমন বহির্বিশ্বে পৌঁছে যাবে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোয় আমরা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবো।
বক্তব্য শেষে মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করে উদ্বোধনী স্মারকে স্বাক্ষর করেন তিনি। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘বঙ্গবন্ধুর বীরত্বগাথা’ ব্রেইল বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তার নিজের লেখা ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ বইয়ের ব্রেইল সংস্করণ মোড়কেরও উন্মোচন করেন শেখ হাসিনা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আসিফ রূপম ব্রেইল বই থেকে একটি কবিতা পাঠ করেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন। এর আগে ২০১৫ সালে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য ১০টি ক্যাটাগরিতে ১১ জনের হাতে বাংলা একাডেমির স্মারক ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

[the_ad id=”249″]

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 15 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ