২০১৫-২০১৬ সনের সন্ধিক্ষণে নববর্ষের প্রত্যাশা- খন্দকার মামুন আলী আখতার

প্রকাশিত: 11:10 AM, December 31, 2015

২০১৫-২০১৬ সনের সন্ধিক্ষণে নববর্ষের প্রত্যাশা- খন্দকার মামুন আলী আখতার

mamunaliaktherস্টাফ রিপোর্টার:গ্রেগরীয় সন ২০১৫’র শেষে বছরের সাল তামামী করতে যখনই হিসাবের খাতা খুলছি তখনই দেখছি রক্ত খরচ লেখা, বছরের শুরুতেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বর্ষপূতি উপলক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখো মুখি অবস্থান গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ দিনটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসাবে পালন করে আর বিএনপি গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসাবে পালন করতে চায়। বিএনপি দিনটিতে একটি জনসমাবেশ করতে চাইলে সরকার তাদেরকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি, এমনকি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই অবরুদ্ধ করে রাখেনি। বাসার সামনে বালু বোঝাই ট্রাক দাড় করে রাখে যাতে বেগম জিয়ার গাড়ী বাসা থেকে বের হতে না পারে। অপরদিকে বিএনপি ও বেগম জিয়া দেশব্যাপী অবরোধ হরতাল আহবান করে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করেন আর এতে যুক্ত করেন পেট্রোল বোমার ব্যবহার, গান পাউডারের, অগ্নিসংযোগের ব্যবহার। ঘটে ৭০ জন নিরিহ নাগরিকের প্রাণহানি, সংঘটিত হয় ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি।
বিএনপি আহুত এই অনিদৃষ্ট কালের অবরোধকে জামায়াতে ইসলামী তার নিজস্ব পদ্ধতিতে মদত যোগায়। বিএনপি, জামায়াতের এই আন্দোলনে তাদের কোন লাভ না হলেও সরকারকে লাভবান করে দেয়। এতে করে বিএনপি কার্য্যত পরাজিত হয়, আর বিএনপির পরাজয় আওয়ামী লীগকে করে তুলে কর্তৃত্ব বাদী। কতৃত্ববাদীতা আওয়ামী লীগকে করে তুলে রাজনীতি বিমুখ মস্তান নির্ভর আর সরকারকে করে তুলে র‌্যাব পুলিশ নির্ভর।
অপরদিকে বিএনপির মানুষ পোড়ান, গাড়ী পোড়ানোর রাজনীতি দলটির কপাল পুড়িয়েছে। যে কারনে দলটি এখন তার অস্তীত্বের সংকটে ভুগছে। ২০১৫ সালেই যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় দন্ডিত বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতে সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মো. কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড মার্কিযুক্ত রাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, পাকিস্তান, তুরস্ক সহ মধ্য প্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ও জাতিসংঘের তীব্র বিরোধীতার মুখে কার্য্যকর করা হয়েছে। এ সাফল্যের জন্য অবশ্যই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধুবাদের দাবী দার।
এ বছরেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা উত্তর দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও শেষ মুহুর্তে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাড়ায়। আর অন্যান্য দলগুলো নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপির অভিযোগ করে। এর মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো দেশের ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫ জানুয়ারী ২০১৪’র নির্বাচনের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিতহলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বি অপরদল বিএনপি তার সহিংসতার পথ পরিত্যাগ করে নির্বাচনের পথে ফিরে আসে। যদিও নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠ হয়নি।
অন্যদিকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে কঠোর অবস্থানের কারনে রাজনৈতিক মাঠে গণতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতিতে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হয় এবং এ বছরেই এই উগ্রধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে ৫ জন মুক্ত চিন্তার লেখক প্রকাশক নিহত হন। এই হত্যাকান্ডগুলোর রহস্য উন্মোচন বা ঘাতকদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। যদিও দেশে অব্যাহত ভাবে চলছে বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড। দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যখন বলছেন কোন বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড ঘটছেনা তখন দেশের মানবাধিকার কমিশনন চেয়ারম্যান বলছেন বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।
একদিকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, জঙ্গিবাদী নাশকতা অন্যদিকে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায় নারী ও শিশু নির্যাতন। ঘটে রাজন, রাকিব, সাঈদ হত্যাকান্ডের মত লোমহর্ষক হত্যাকান্ড তবে আশার কথা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আলোচিত এই তিন হত্যা কান্ডের বিচারও সম্পন্ন হয়। আর অপরাধীদের দেয়া হয় সর্বোচ্চ শাস্তি।
২০১৫-তে দেশে ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাস অতীতের তুলনায় অনেক গুন বেড়ে যায়। এ বছরেই ঘটছে রাজধানীর হোসনী দালানে পবিত্র মহরমের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা, বগুড়ার একটি মসজিদে নামাজরত মুসল্লীদের গুলি করে হত্যা, দিনাজপুরে কান্তজীর মন্দিরে রাস উৎসবে বোমা হামলা, পাবনায় খৃষ্টান ধর্ম যাজককে গলা কেটে হত্যা চেষ্টা, রাজশাহীতে কাদিয়ানী মসজিদে জুমার নামাজের সময় আত্মঘাতি বোমা হামলা, পতেঙ্গা নৌবাহিনী ঘাটি মসজিদে জুমার নামাজে বোমা হামলা, দুজন বিদেশী নাগরিককে হত্যাসহ নানা নাশকতা। প্রতিটি নাশকতার দায় আইএস নামক জঙ্গি সংগঠন স্বীকার করলেও সরকার বলছে আইএস নেই, একটি পরাশক্তি দেশের উপর হামলে পড়তে আইএসএর কথা বলছে। যতিও এই ভাসুরের নাম কেউ মুখে তুলছেন না।
সমস্ত প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে এ বছরে পদ্মা সেতুর নির্মান কাজ শুরু হয়, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মানে রাশিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ঢাকা চট্টগ্রাম সড়ক ও ঢাকা ময়মনসিংহ সড়ক চারলেনে উন্নীত করন কাজ শুরু হয়েছে, ভারতের সাথে ৬৮ বছরের বিরাজমান ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়। সম্পন্ন হয় ছিটমহল বিনিময়, ভারতের সাথে সমুদ্র সীমা নির্ধারন মামলায় বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে, তবে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমাদের পাওনা আদায় ও আটকে পড়া পাকিস্থানীদেরকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কোন অগ্রগতি হয়নি।
সাদা চোখে দেখলে ২০১৫ সাল রাজনৈতিক সংঘাত সংঘর্ষ, মানুষ খুন, বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড দিয়ে শুরু হয়ে শেষহচ্ছে উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিবাদী হামলা, হত্যা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে।
গ্রেগরীয় সন ২০১৫’র বিদায় ও ২০১৬’র আগমন সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে নাগরিক হিসাবে আমাদের কামনা ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দু লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ বিনির্মানে গড়ে উঠুক জাতীয় ঐক্য। একটি সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ২০১৬ হউক বাঙ্গালী জাতির কাছে মাইলফলক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 13 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ