আলবদর থেকে ধনকুবের মীর কাশেম

প্রকাশিত: 12:00 PM, December 15, 2015

আলবদর থেকে ধনকুবের মীর কাশেম

110227Atok-1173-253x300জাফর ওয়াজেদ:মুক্তিযুদ্ধ তখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। পাকিস্তানি হানাদার সেনারা শহর ছাড়িয়ে তখনো গ্রামে পৌঁছায়নি। সবে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত বা তাদের প্রশিক্ষণও শুরু হয়নি। ঠিক সে সময় স্বাধীনতা যুদ্ধকে নস্যাৎ করার জন্য সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী আলবদর গঠন করা হয়। এপ্রিল মাসের শেষদিকে শিক্ষিত জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীদের সমন্বয়ে জামালপুরে প্রথম গঠিত হয় আলবদর বাহিনী। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধরত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তানি জীবনদর্শনে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করা। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে বদর বাহিনী সার্বিকভাবে জামায়াতে ইসলামী তথা গোলাম আযমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের খুঁজে বের করা, হিন্দুদের বলপূর্বক মুসলমান বানানো, সেমিনার ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ তথা আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারণা, প্রয়োজনে সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করা এবং জামায়াতি চিন্তাধারার প্রচার-প্রসার ঘটানো ও হানাদারদের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা করা ছিল এদের তৎপরতার মূল দিক। বদর বাহিনীর নৃশংসতা জনমনে ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
হানাদারদের দখল করা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় জামায়াত ও ছাত্রসংঘের সদস্য সমন্বয়ে সশস্ত্র বদর বাহিনী গড়ে ওঠে। সর্বত্র এদের নিজস্ব ‍‍‍ক্যাম্প ছিল। যেখান থেকে ‌অপারেশন পরিচালনা করা হতো। এসব ঘাঁটিতে ধরে আনা হতো মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ সমর্থক ও হিন্দুদের। ক্রমাগত নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। মুক্তিযুদ্ধ অপ্রতিরোধ্যভাবে বিজয়াভিমুখ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের তৎপরতা বাড়ছিল ভয়াবহভাবে। শেষের সেদিন ছিল ভয়ংকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপক, লেখক, সাংবাদিক, এবং সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নি¤œপর্যায়ের চাকরিজীবী এমনকি সামান্য শিক্ষিত বাঙালী মূলত বদর বাহিনীর নৃশংস শিকারে পরিণত হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার উপদেষ্টা জেনারেল রাও ফরমান আলীর নীল নকশা অনুযায়ী বদর বাহিনী এই ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়েছিল। বিশেষত যুদ্ধশেষের আগের কয়েকটি দিনে ঢাকায় সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এর প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
জামায়াতের আমির গোলাম আযমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো বদর বাহিনী। বদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, প্রাদেশিক প্রধান । মীর কাশেম আলী তৃতীয় নেতা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ছিলেন প্রধান সংগঠক। জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম বদর বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে আলবদর শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আলবদর একটি নাম। একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানেই। যেখানেই দুষ্কৃতকারী, আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’
১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর দৈনিক পাকিস্তান আগের দিন ঐতিহাসিক বদর দিবস পালন উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ইসলামী ছাত্রসংঘের সমাবেশের ওপর প্রতিবেদন ছাপে। পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘর সাধারণ সম্পাদক ও বদর নেতা মীর কাশেম আলী বদর দিবসের শপথ হিসেবে তিনটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রথমত, ভারতের আক্রমণ রুখে দাঁড়ানো, দ্বিতীয়ত, দুষ্কৃতকারীদের খতম করা এবং তৃতীয়ত, ইসলামী সমাজ কায়েম করা। জমায়েত শেষে ‘আমাদের রক্তে পাকিস্তান টিকবে’, ‘বীর মুজাহিদ অস্ত্র ধর ভারতকে খতম কর’, ‘মুজাহিদ এগিয়ে চল, কলকাতা দখল কর’ এবং ‘ভারতের চরদের খতম কর’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে ঢাকার রাজপথে উল্লাস মিছিল করে। পরদিন দৈনিক সংগ্রাম লিখেছিল, ‘মিছিলকারী জিন্দাদিল তরুণরা ভারতীয় দালালদের খতম কর’; ‘হাতে লও মেশিনগান দখল কর হিন্দুস্থান’, ‘আমাদের রক্তে পাকিস্তান টিকবে’ প্রভৃতি স্লোগানে রাজধানীর রাজপথ মুখরিত করে তোলে।
১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর মীর কাশেম আলী এক বিবৃতিতে ‘সৈনিক হিসেবে প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার জন্য’ সংগঠনের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান। এই সময়কালে প্রকাশিত এক প্রচারপত্রে বলা হয়েছিল, ‘শত্রু আশপাশেই রয়েছে। তাই সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালাতে হবে। মনে রাখবেন, আপনারা পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্যই কেবল যুদ্ধ করছেন না, এ যুদ্ধ ইসলামের। নমরুদের হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য আমাদের আমিরের (গোলাম আযম) নির্দেশ পালন করুন।’ আলবদরের নৃশংসতার বিবরণ স্বাধীনতার পর পর বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। যে সব চিত্র বিধৃত হয়েছে, তা হিটলারের গোস্টাপো, ভিয়েতনামের মাইলাই কিংবা লেবাননে প্যালেস্টাইনিদের সাবরা শাতিল শিবিরের হত্যাযজ্ঞের চেয়েও হাজার গুণ ভয়াবহ। বদর বাহিনীর হাতে শুধু ঢাকার শত শত বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক ও শিল্পীই প্রাণ হারাননি, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত বিশিষ্ট নাগরিকও রেহাই পাননি। ভিন্নমতাবলম্বীর অনেক আলেমও তাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব মর্মন্তুদ ঘটনার অনেক বিবরণ আজো অপ্রকাশিত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পাশাপাশি আলবদর বাহিনীও পরাজিত হয়। তবে হানাদার বাহিনীর পাশাপাশি তারা আত্মসমর্পণ করেনি। মীর কাশেমসহ অন্যরা আত্মগোপন করে। কেউ পালিয়ে পাকিস্তানসহ অন্য দেশে চলে যায়।
১৯৭৭ সালে মীর কাশেম আলীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ইসলামী ছাত্রসংঘকে রূপান্তর করে গড়া হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। মীর কাশেম আলী এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। গোলাম আযমের অর্থ সংগ্রহের তহবিলটা একসময় মীর কাশেমের কুক্ষিগত হয়। মীর কাশেম নিজেও অর্থ সংগ্রহে নেমে পড়েন। ছাত্রশিবির সভাপতির পদ ছেড়ে যোগ দেন সৌদি আরবভিত্তিক এনজিও রাবেতা আলম নামক সংস্থায়। যে সংস্থাটি বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের সাহায্য-সহযোগিতার কাজে নিয়োজিত থাকার আড়ালে জামায়াত-শিবির প্রতিষ্ঠার কাজ করতে থাকে। তাদের মাধ্যমে আর্থিক যোগানও আসতে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংস করা হয়েছে, বহু মুসলমান নির্যাতিত ইত্যাদি বানোয়াট তথ্য দিয়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করেন মীর কাশেম।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি পদ ছাড়ার ৪ বছরের মাথায় মীর কাশেম আলী ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশে জামায়াতিদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিব। গোলাম আযমের ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় ব্যাংকটির পরিচালক মনোনীত হন। মীর কাশেম ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হন। শুরুতে পরিচালকম-লী ও শরিয়া কাউন্সিলের সব সদস্যই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শূরার সদস্য। এরা হলো কামালউদ্দিন জাফরী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহম্মদ আলী, আবদুল জব্বার, শামসুদ্দিন আহমদ, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ব্যাংকের একটি জাকাত তহবিল রয়েছে। ব্যাংকের আয়ের শতকরা আড়াই ভাগ যায় জাকাত তহবিলে। এর প্রায় পুরোটাই জামায়াত তার রাজনৈতিক কর্মকা-ে ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। এই ব্যাংকের ঋণের সুযোগ-সুবিধা জামায়াতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এমনকি জামায়াতের বাইরের কোনো লোককে কর্মচারীও বড় একটা নিয়োগ করা হয় না।
মীর কাশেম আলী ব্যাংকটি গঠনের পর অন্যান্য খাতেও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ইবনে সিনা ট্রাস্ট, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, সংবাদপত্র, টেলিভিশন কেন্দ্র, শিক্ষা সব খাতেই বিনিয়োগ করেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তথা সিআইপি মর্যাদা নিয়েও বিদেশে সফর করেছেন। ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মীর কাশেম ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মীর কাশেমের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল, ইবনে সিনা ডায়াগনিস্টিক সেন্টার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল ইত্যাদি। মীর কাশেমের অর্থ দিন দিন এতই বেড়েছে যে, নানা খাতে অর্থলগ্নি করেছে। কেয়ারী নামে ১০টি কোম্পানির পরিচালক মীর কাশেম আলী। যাতে তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানা রয়েছে। এর প্রধান কার্যালয় ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে কেয়ারী প্লাজায়। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার জন্য রয়েছে মীর কাশেমের একক মালিকানাধীন বিলাসবহুল পাঁচটি প্রমোদতরী । এছাড়া মীর কাশেম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ প্রশ্নবিদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দুই কোটি ৫০ লাখ ডলার দেন ।
মীর কাশেম ছিলেন একাত্তরের আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা নেতা। দুই দশকের মধ্যেই তিনি ধনকুবেরে পরিণত হন। তার এই উত্থানের পেছনে যে কত মিথ্যাচার জড়িত, তা ক্রমে প্রকাশিত হচ্ছে। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত মীর কাশেম মূলত জামায়াতের অর্থদাতা। জামায়াতের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানই তার হাতে গড়া এবং তার ওপর নির্ভরশীল। রায় কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতি কি দাঁড়ায় সেটা স্পষ্ট হবে আগামীতে। মীর কাশেম ইডেন শিপিং লাইন্সের চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্ট, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও ফুয়াদ আল খতিব ফাউন্ডেশনের। ইসলামী ব্যাংক স্কুল ও কলেজের অন্যতম উদ্যোক্তাও মীর কাশেম।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ সালের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক থেকে মীর কাশেম ক্রমেই পরিণত হন ধনকুবেরে। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে স্নাতক শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ইসলামী ছাত্রসংঘের কলেজ সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সাল হতে ক্রমে সম্পদশালী হয়ে ওঠার পেছনে কোনো আলাদীনের চেরাগ হয়ত ছিল। তবে বাংলাদেশের মানুষ এই ঘাতকের দিন দিন ফুলে ফেঁপে ওঠার বিষয়টি টের পেতে অনেক সময় নিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 11 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ