বিপ্লবী রাসবিহারীর জাপান আগমনের শতবর্ষ স্মরণে

প্রকাশিত: 7:53 AM, December 15, 2015

NBপ্রবীর বিকাশ সরকান:ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু আজ জাপানে এক কিংবদন্তি পুরুষ। এ বছর তাঁর জাপান আগমনের শতবর্ষ পূরণ হলো। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় তাঁর জন্ম (১৮৮৬)। ১৫ বছর বয়স থেকেই স্বাধীনতা মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তরুণ বয়সে এই বাঙালি বীর ভারতে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যা ও আরেকটি সিপাহি বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে মহা ষড়যন্ত্র করেছিলেন। যা ইতিহাসে দিল্লি ষড়যন্ত্র ও লাহোর ষড়যন্ত্র নামে খ্যাত। দুর্ভাগ্যক্রমে দুটো পরিকল্পনাই বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে রাসবিহারী বসু জাপানে পালিয়ে আসেন ১৯১৫ সালের জুন মাসে। তখন তাঁকে ধরিয়ে দেবার জন্য তাঁর মাথার ওপর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ১২,০০০ রুপি তথা ৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ডের পুরস্কার ঝুলছিল।
তাঁর আগমনের কয়েক মাস পর আসেন আরেক দুর্দান্ত বিপ্লবী হেরেম্বলাল গুপ্ত, একই পুরস্কারের অঙ্ক মাথায় নিয়ে। তাঁদের দুজনকে জাপানি পুলিশের হাত থেকে রক্ষার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তৎকালীন প্রভাবশালী গণমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা রাজনীতিক ও গেনয়োশা নামক গুপ্ত সমিতির পরিচালক গুরু তোয়ামা মিৎসুরু। তাঁকে আরও যাঁরা সহযোগিতা করেন ও পরবর্তীকালে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন তাঁরা হলেন কুজো য়োশিহিসা, উচিদা রিয়োহেই ও সুগিয়ামা শিগেমারু প্রমুখ আদর্শ এশিয়াবাদী (প্যান-এশিয়ানিস্ট) রাজনীতিকেরা। তাঁদের আগমনের কয়েক মাস পর জাপান সফরে আসেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের চরমপন্থী নেতা, ভয়ংকর বিপ্লবী বলে পরিচিত লালা রাজপথ রায়। রাসবিহারী বসু তাঁর আগমনকে উপলক্ষ করে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করতে মনস্থির করেন। কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অর্থাৎ তিনি চাচ্ছিলেন জাপানি সমাজে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচার করতে, যাতে করে জাপানি নাগরিকেরা প্রবাসী বিপ্লবীদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে, পাশাপাশি ভারতে ব্রিটিশের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। যদিও জাপান তখন ব্রিটিশের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ।
ইতিমধ্যে হেরেম্বলাল গুপ্তের সঙ্গে তখনকার প্রখ্যাত প্যান-এশিয়ানিস্ট ও ভারতীয় দর্শনের তুখোড় তরুণ বুদ্ধিজীবী ওকাওয়া শুমেই এর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি গভীরভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। সম্ভবত তাঁরই পরামর্শে উয়েনো শহরের বিখ্যাত সেইয়োকেন্ মিলনায়তনে সম্রাট তাইশোও (১৯১২-২৬)-এর সিংহাসন আরোহণকে কেন্দ্র করে একটি অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাতে মূল লক্ষ অনুসারে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন লালা রাজপথ রায়, রাসবিহারী বসু ও হেরেম্বলাল গুপ্ত। তোয়ামা মিৎসুরুসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন।

এই অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ দূতাবাসের কতিপয় গুপ্তচর উপস্থিত ছিল। তারা যথাসময়ে বিবরণ উপস্থাপন করে রাষ্ট্রদূতকে। পরের দিন ব্রিটিশ দূতাবাস জাপান সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে বিপ্লবীদের ধরিয়ে দেবার জন্য। সরকার বাধ্য হয়ে তাঁদের জাপান ত্যাগের নির্দেশ জারি করে। লালা রাজপথ রায় আমেরিকা চলে যান। রাসবিহারী ও হেরেম্বলালকে গুরু তোয়ামা আশ্রয় প্রদান করেন। তাঁদের তাঁর বাড়ির কাছেই শিনজুকু শহরে অবস্থিত তৎকালীন সুবিখ্যাত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নাকামুরায়ার কর্ণধার সোওমা আইজোওর সঙ্গে আলাপ করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি পরিত্যক্ত ছবি আঁকার স্টুডিও ভবনে লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর পুলিশ ঠিকই তাঁদের গুপ্ত অবস্থান জানতে পারে। এর মধ্যে হেরেম্বলাল বন্দী অবস্থায় অস্থির হয়ে বেরিয়ে পড়েন ও ওকাওয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মাস চারেক সেখানে থাকার পর আমেরিকায় চলে যান।NB
এদিকে যখন রাসবিহারী বসুকে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রেখেও যখন আর কিছুতেই বাঁচানো যাচ্ছে না তখন তোয়ামা মিৎসুরু সোওমা আইজোওকে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা তখন ছাত্রী সোওমা তোশিকোর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অপ্রত্যাশিত এই প্রস্তাবে সোওমা দম্পতি মহা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। কিন্তু তাঁদের রক্ষা করেন তোশিকো নিজেই এগিয়ে এসে। প্রস্তাবিত বিয়েতে তিনি রাজি হন। বলেন, মি. বোস স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জাপানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে সহযোগিতা করতে চাই, আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও।
কিন্তু বিয়ের পরও কয়েক বছর বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে জীবন যাপন করতে হয়েছে নবদম্পতিকে। শাশুড়ি সোওমা কোক্কোর ডায়েরি থেকে ১৭ বার বাসা বদলের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুসন্তানের জনক হন রাসবিহারী বসু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপে শান্তি স্থাপিত হয়। রাসবিহারী বসুরও পলাতক জীবনের ইতি ঘটে। জাপানি নাগরিকত্ব গ্রহণ করে মুক্তির আলোয় বেরিয়ে আসেন। কিন্তু দাম্পত্য সুখ বেশি দিন ভাগ্যে সইল না। পলাতক জীবনে স্ত্রী অমানবিক কষ্ট সহ্য করেছেন। ঠান্ডা থেকে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ভুগে ১৯২৬ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে পরলোকে যাত্রা করেন। পরলোকগত স্ত্রীর ভালোবাসার সম্মানার্থে রাসবিহারী বসু আর বিয়ে করেননি জীবনে। পত্নী বিয়োগের পরের বছর নাকামুরায়া প্রতিষ্ঠানের দ্বিতলে ভারতীয় কারি রেস্টুরেন্ট ইনদো নো মোন বা ভারতের তোরণ প্রতিষ্ঠা করেন। ৮৮ বছর পেরিয়ে এই কারি রেস্টুরেন্ট এখনও নাকামুরায়া নো কারেএ নামে জাপানে পূর্ববৎ জনপ্রিয়। রাসবিহারী বসুই প্রথম জাপানে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় মসলায় রাঁধা চিকেন কারি প্রচলন করেন। একই ধরনের সুস্বাদু কারি আজও পাচক উপহার দিচ্ছেন প্রতিদিন।
এই রেস্টুরেন্ট হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পর্যন্ত ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এখানে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থনকারী জাপানি রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনায় বসতেন। অবশ্য অন্যান্য প্রবাসী ভারতীয়রাও আসতেন বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে।
আপন গৃহে রাসবিহারী বসুভারতীয় স্বাধীনতা অর্জনে জাপানপ্রবাসী রাসবিহারী বসুর অবদানের কথা বলতে গেলে এটাই শুধু বলতে হয় যে, তিনি না এলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কোন পথে যেত ও কবে স্বাধীনতা আসত বলা মুশকিল। মূলত তাঁর প্রচেষ্টার জোরেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জাপানে আহুত হয়েছিলেন। তাঁর হাতেই সমর্পণ করেছেন ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের (ILL: Indian Independence League) সভাপতির দায়িত্ব। আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA: Indian National Army) গঠনেও ছিল তাঁর বিশেষ অবদান। নেতাজি গঠিত স্বাধীন ভারত সরকারের (Free India Government/Provisional Government) তিনি ছিলেন সম্মানিত উপদেষ্টা। তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের অবসান ঘটে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে হিদেয়ুকি বোস জাপানি সেন্য হিসেবে ওকিনাওয়া যুদ্ধে NBমিত্রশক্তি মার্কিনী সেনাদের হাতে প্রাণ হারান। মেয়ে তেৎসুকো (বসু) হিগুচি নামে জাপানি প্রকৌশলীকে বিয়ে করে বর্তমানে বার্ধক্য জীবন অতিবাহিত করছেন। একবারও যেতে পারেননি স্বাধীন পিতৃভূমিতে। কেন যেতে পারেননি সেও এক রহস্য। স্বাধীন ভারতের কোনো রাজনীতিক তাঁকে তাঁর পিতৃভূমিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কিনা জানি না, জানালে নিশ্চয়ই তিনি যেতেন। তবে মেয়ে তথা রাসবিহারীর দৌহিত্রী মাতামহের জন্মস্থান একবার ঘুরে এসেছেন। সম্প্রতি ভারত-বিষয়ক বিশিষ্ট তরুণ গবেষক নাকাজিমা তাকেশি তেৎসুকো হিগুচির মুখে শোনা তাঁর পিতার কাহিনি একটি চমৎকার গ্রন্থ চিচি বোউসু—পিতা বোস-এ লিপিবদ্ধ করে মহৎ কাজ সম্পাদন করেছেন। বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জীবন সত্যি একটি শিক্ষামূলক বৈচিত্র্যময় উপন্যাস বললে অত্যুক্তি হবে না।
রাসবিহারী বসুর মৃত্যুর পর ৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু আজও তিনি প্রবীণ জাপানিদের মনে বিখ্যাত ইনদো শিশি—ভারতীয় বীরপুরুষ ভাবমূর্তিতে অধিষ্ঠিত। শিনজুকু শহরের নাকামুরায়া মানেই রাসবিহারী বসু। কিন্তু বাঙালি জানে না তাঁর ইতিহাস। আজকে এই যে দুই বাংলা থেকে হাজার হাজার বাঙালি জাপানে এসে কাজ ও ব্যবসা করছেন এবং স্বদেশি সংস্কৃতি বিকাশে সংগঠন-সমিতি প্রতিষ্ঠা করছেন এর সূচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৩৩ সালে শিনজুকু শহরে এশিয়া হাউস নামে একটি ৮ কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতল রেস্টহাউস স্থাপন করেছিলেন, সেখানে ৫৮ জন এশিয়ান বসবাস করতেন। এখানে এশিয়ার মুক্তি, জাপানের সঙ্গে এশিয়ার ভাতৃবন্ধন, সাংস্কৃতিক বিনিময় সভা, আলোচনা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পান-ভোজনাদি অনুষ্ঠিত হতো। বিখ্যাত পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিক পর্যন্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসতেন। রাসবিহারী বসু জাপানে ভারতীয়সহ এশিয়ানদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য কারি ভোজ দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতেন। অবশ্য জাপানি খাবার-দাবার যে ছিল না তা নয়। তবে নাকামুরায়া প্রতিষ্ঠানের দোতলায় ভারতীয় রেস্টুরেন্টে তাঁর নিজের হাতে তৈরি ইন্ডিয়ান কারি-রাইস খাবারের সুনাম ইতিমধ্যে টোকিওসহ বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এশিয়া হাউসে সভা মানেই ভারতীয় কারি—বিপ্লবী রাসবিহারী বসু নিজে তৈরি করবেন বলে একটা রীতিতেই পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যমান ছিল।
শুধু তাই নয়, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রবাসী ভারতীয়দের একত্র করার জন্য তিনি ভারত মৈত্রী সমিতি নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুধু যে ভারতীয়রা আসতেন তা নয়; ভারত, এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রতি আগ্রহী জাপানিরা আসতেন। আলাপ-আলোচনা ও পান-ভোজনাদি হতো ঘটা করে। প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালের ৩০ জুন তারিখে তাঁর রেস্টুরেন্টের ভেতরে। তাতে ৩১ জন উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তৎকালীন জাপানের আন্তর্জাতিক কবি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু নোগুচি য়োনেজিরো বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সমিতির সর্বমোট ১০টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সমিতি থেকে ১৯৩৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনের সম্মেলনে জাপান থেকে একজন প্রতিনিধি প্রেরণের সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। আবার ভারত থেকে বিশেষ অতিথি কেউ এলে তাঁর স্মরণে বিশেষ সভারও আয়োজন করেছেন। যেমন জাপানে প্রাচ্য গবেষণা সংস্থায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার, স্বনামখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু রাষ্ট্রপাল সান্ধিরিয়া; বিশ্বভারতীর শিল্পী-অধ্যাপক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন বলে জানা যায়, তাঁরা বিশেষ সভায় আলোচনা ও বক্তৃতা করেন।
পরিণত বয়সে রাসবিহারী বসু (বাঁ থেকে তৃতীয়)। তাঁর বাঁয়ে শ্বশুর সোওমা আইজোও ও ডানদিকে গুরু তোয়ামা মিৎসুরুনানাবিধ কাজের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করতেন। ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্ম, লোকসাহিত্য এবং ভারতে ব্রিটিশের শাসন-শোষণ নিয়ে অনেক লেখা জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী ও সংকলনে প্রকাশ করেছেন। অধিকাংশই জাপানি ভাষায়। এশিয়ানদের মুখপত্র হিসেবে নিজ ব্যয়ে মাসিক নিউ এশিয়া নামে একটি তথ্যভিত্তিক কাগজ প্রকাশ করেছিলেন কিছুদিন। স্বনামে ও যৌথভাবে প্রায় ১৩-১৪টি গ্রন্থ লিখে রেখে গেছেন। তাঁর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেছেন। চরমপন্থী বিপ্লবী হলেও তিনি যে রোমান্টিক ছিলেন তাতে প্রমাণিত হয়। কবিগুরুর সঙ্গে তাঁর জাপানে একাধিকার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁকে ঘটা করে সংবর্ধনা দেন। ১৯২৪ সালের জুন মাসের একদিন তাঁর বাড়িতে এসে কবি পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিশ্বভারতীর জন্য চাঁদা তুলে কবির হাতে দেন। স্ত্রীর মাসতুতো বোন মাকি হোশিকে শান্তিনিকেতনে পাঠান ইকেবানা ও চা-অনুষ্ঠানের প্রশিক্ষক হিসেবে। ১৯৩১ সালে চীনের মাঞ্চুরিয়া রাজ্য জাপান আক্রমণ করলে রবীন্দ্রনাথ মনঃক্ষুণ্ন হন ও এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন। ১৯৩৭ সালে যখন চীন-জাপান দ্বিতীয় যুদ্ধ বাঁধে তাতে রবীন্দ্র নাথসহ ভারতের অনেক রাজনীতিবিদ প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় তোলেন জাপানের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে, মাঞ্চুরিয়ার আসল ইতিহাস ও ঘটনা এবং দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের পটভূমি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ অনেক কিছুই জানতেন না বলে গবেষকেরা মনে করেন। তাঁর কানে ভুল তথ্য দিয়ে থাকবেন তখন শান্তিনিকেতনে অবস্থানরত চীনা ভবনের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। যা হোক, চীন আক্রমণ নিয়ে ভারতে যখন জাপানবিরোধী প্রতিবাদ তুঙ্গে তখন জাপানিরাও দারুণ মনঃক্ষুণ্ন হন। ২০ বছরের পুরোনো বন্ধু কবি নোগুচি য়োনেজিরো এই সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বেশি নিরাশ হন রাসবিহারীকে সুদীর্ঘ ২১ বছর ধরে যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছিলেন ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে তাঁরা। রাসবিহারী বসু এই মহাসংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে ও রবীন্দ্রনাথকে প্রকৃত ঘটনা বুঝিয়ে বলার জন্য তাঁকে ১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর তারিখে জাপানে আসার আমন্ত্রণপত্র পাঠান জাহাজ ভাড়াসহ ৫০,০০০ ইয়েন বাজেটসহ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই প্রস্তাবে রাজি হননি, উত্তরে তিনি লিখেন, ‘দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে আমার শরীর উত্তম পর্যায়ে নেই। কিন্তু জাপানের প্রতি আমার যে মিশন তা বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত আয়োজন করে থাকলে তোমার প্রস্তাব বিবেচনা না করলে নয়। আমার মিশন হচ্ছে, এখন এশিয়ার যে দুটি মহাজাতি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের মধ্যে সংস্কৃতি ও মৈত্রী সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু জাপানি কর্তৃপক্ষ আমাকে মুক্ত চিত্তে চলার ও বলার সুযোগ দেবে কিনা এই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কাজেই জাপান ভ্রমণ করে ছলচাতুরীর মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে চাই না। তথাপি জাপানের প্রতি আমার সত্যিকারের ভালোবাসা বহন করছি।’ এই কারণে অনেক ভারতীয় ও বাংলাদেশি রাসবিহারী বসুকে জাপানের দালাল বলে কটাক্ষ করেন যা কিনা অজ্ঞতার পরিচায়ক ছাড়া আর কিছু নয়। যাঁরা ইতিহাস সচেতন তাঁরাই তাঁকে বীর দেশপ্রেমিক হিসেবে সম্মান করেন ও ভবিষ্যতেও করবেন।
মৃত্যুর পূর্বে জাপান-ভারত সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার মূল্যায়নস্বরূপ শোওয়া সম্রাট হিরোহিতো কর্তৃক রাসবিহারী বসুকে সর্বোচ্চ রাজকীয় সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

প্রবীর বিকাশ সরকান: জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 13 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ