আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

প্রকাশিত: 6:13 AM, December 14, 2015

আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

02আজ ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে একটি স্মরণীয় ও কলঙ্কের দিন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা বেদনাবিধুর দিন আজ। বাঙালির মেধা-মনন-মনীষা শক্তি হারানোর দিন আজ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস রক্তগঙ্গা পেরিয়ে গোটা জাতি যখন উদয়ের পথে দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই সময়ই রাতের আঁধারে পরাজয়ের গ্লানিমাখা পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করে। বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে এদিনে দেশকে মেধাশূন্য করার পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে ঘর থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বাঙালি জাতির সেরা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ দেশের বরেণ্য ও কৃতী সন্তানদের।
জাতির এসব উজ্জ্বল নক্ষত্র হত্যার মাধ্যমে হানাদাররা আমাদের মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল লড়াকু বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করলেও যেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু, দুর্বল ও দিক-নির্দেশনাহীন হয়ে পড়ে। মেধা ও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়লে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না— এমন নীল-নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই হায়েনারা বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল এই দিনে। স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ ৪৩ বছর পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী হিসেবে ইতিমধ্যে পাঁচজনের বিচারের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিত্সক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ড. জি সি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আনম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নূতন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, হাবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীন, সায়ীদুল হাসানসহ আরো অনেকে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে অনুসরণ করে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সমাজ গড়তে পারলেই তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এদিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের, যাঁরা ১৯৭১ সালে বিজয়ের প্রাক্কালে হানাদারবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত্ বরণ করেন। আমি তাঁদের পরিবারবর্গের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।’ তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবীরা দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির রূপকার এবং সর্বকালে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে দল-মত-নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে একাত্তরের ঘাতক, মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতচক্রের সকল ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধীদের যারা রক্ষার অপচেষ্টা করছে তাদেরও একদিন বিচারের আওতায় আনা হবে। এসব রায় বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।
তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।’ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জামায়াত ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে পাক হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার পাপাশি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ করে। শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালি জাতির বিজয়ের প্রাক্কালে তারা দেশের শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিত্সক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, প্রকৌশলী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদসহ দেশের সেরা সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে। ক্ষমতাসীনরা বিভেদের মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। দেশকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিবৃতিতে বেগম জিয়া বলেন, ১৪ ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন, বাংলাদেশকে মেধা-মননে পঙ্গু করার হীন উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বিজয়ের ঊষালগ্নে হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক, বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। তারা মনে করেছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই সদ্য স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশ মেধার উত্কর্ষহীনতায় নেতৃত্বহীন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সে হীন উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে। খালেদা জিয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 10 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ