সুপারিশ না রাখায় ক্ষুব্ধ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা

প্রকাশিত: 8:54 AM, December 4, 2015

সুপারিশ না রাখায় ক্ষুব্ধ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা

ZNপ্রান্ত ডস্কে:যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কে এম আই খলিল দাউদকান্দি পৌরসভায় বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর পক্ষে তৃণমূলের সর্বস্তরের সুপারিশ ছিল। কিন্তু তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য জোর সুপারিশ ছিল স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের। তাঁর পছন্দের প্রার্থী ছিলেন স্থানীয় পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নঈম সরকার। তাঁর মনোনয়ন নিশ্চিত করতে খন্দকার মোশাররফের বার্তা নিয়ে তাঁর ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন গত ১ ডিসেম্বর পুরো সময়টাই ছিলেন গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে। কিন্তু কেন্দ্র সেই সুপারিশ রাখেনি। এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবারও খন্দকার মোশাররফের পক্ষে নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ গিয়েছিলেন দাউদকান্দিতে খলিলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ঠেকাতে। কিন্তু তৃণমূলের প্রতিরোধে তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হন।
বিএনপির প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট নেতাদের প্রার্থীকে মনোনীত না করার ঘটনা আরো আছে। বরিশালের মুলাদী পৌরসভায় উপজেলা বিএনপির সদস্য হারুনুর রশিদ খান অথবা স্থানীয় বিএনপি নেতা আহসানের জন্য সুপারিশ করেছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সেলিমা রহমান ও বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার। কিন্তু উপেক্ষিত হয়েছে তাঁদের মতামতও। সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদ মাহমুদকে। একইভাবে নরসিংদী সদর পৌরসভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানসহ দলের প্রভাবশালী আরো অনেক নেতার সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। জানতে চাইলে ড. মঈন খান অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, সদর পৌরসভার ব্যাপারে তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি। মনোনয়ন বিষয়ে সুপারিশ না রাখা এবং অনেক ক্ষেত্রে মতামত না চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ সিনিয়র নেতা। তাঁরা মনে করেন, মনোনয়ন বিষয়ে স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করলে ভালো হতো।
সূত্র মতে, মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা থাকলেও পুরো বিষয়টি সমন্বয় করেছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর এলাকা দিনাজপুরে ছয়টি পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে। এগুলোর ব্যাপারে কেন্দ্র তাঁর সুপারিশ নেয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের গরজে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের ফোন করেছিলাম। জেলা কমিটির সভাপতিও আমার বাসায় এসেছিলেন। এ কারণে কিছু সুপারিশ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার বেশির ভাগ সুপারিশ রাখা হয়েছে। দু-একটি ব্যতিক্রমও আছে। তার পরও বাস্তবতা হলো, স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে আলোচনা করলে ভালো হতো।’ মনোনয়ন বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো অভিযোগ নেই। তবে তা যে একেবারেই হয়নি এ কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা সত্যি বলছেন না।’
সূত্র মতে, দলের একটি অংশ অভিযোগ তুলেছে, রাজবাড়ী পৌরসভায় বর্তমান মেয়রকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য আবু নেওয়াজ খৈয়ামের ছেলে অর্ণব নিয়াজ মাহমুদকে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় এক নেতা তদবিরও নাকি করেছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিন্ন তথ্য। কারণ বর্তমান মেয়র তোফাজ্জল হোসেন মিয়া পৌর ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, আজ (গতকাল) দেশের সব জায়গায় মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে। সুতরাং কতজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন তা সবাই দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর মতে, মনোনয়নবঞ্চিতরা আক্ষেপ করলেই তা বিদ্রোহ হয়ে যায় না। বিএনপিতে কোনো বিদ্রোহ নেই। যা আছে তা আক্ষেপ এবং সাময়িক।
মনোনয়ন বাণিজ্য বিষয়ে মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, কোনো অভিযোগ কেন্দ্রে আসেনি। যেগুলো আসছে, সেগুলো হচ্ছে মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের আক্ষেপ বা রাজনৈতিক বক্তব্য। তাঁর মতে, ‘শত প্রতিকূলতার মধ্যেও অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অনুরোধ করব—দয়া করে আমাদের মাঠে থাকতে দিন।’
সূত্র মতে, যে বিদ্রোহের কথা উঠেছে তা আমলে নিচ্ছেন না মনোনয়নের সঙ্গে যুক্ত নেতারা। তাঁরা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থী আসবে কোথা থেকে? যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাঁদের পক্ষে তৃণমূল থেকেই সমর্থন ছিল। কারণ এবারের প্রক্রিয়াটাই ছিল ভিন্ন।
নানা গ্যাঁড়াকলে ফেলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হতে পারে বলে আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় যুক্ত নেতাদের। তাই প্রতিটি আসনেই ডামি বা বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে। তাঁরা ‘ধানের শীষ’ বাদ দিয়ে ‘স্বতন্ত্র’ হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যোগ্য কাউকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দিলে বিদ্রোহী প্রার্থীর কথা আসে; এবার যে সুযোগ নেই। কারণ আমরা দায়িত্ব পালন করলেও চেয়ারপারসন সব কিছু সমন্বয় করেছেন। প্রত্যেক প্রার্থীর বায়োডাটা ম্যাডামকে দেখিয়ে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে।’
আলাল আরো বলেন, ‘অর্থ বাণিজ্যের যে কথা উঠেছে তা তৃণমূলে থাকতে পারে, কেন্দ্রের কাছে কোনো তথ্য নেই। যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। এ ধরনের অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় নেতারা দেখবেন। তাঁরা না পারলে আমাদের কাছে আসলে তা তখনই সমাধা করা হবে।’
এত কিছু সত্ত্বেও বিশেষ কারণে খালেদা জিয়া দু-একটি জায়গায় নমনীয় হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। যেমন—নাটোরের গোপালপুর। সেখানে তৃণমূলের চাহিদা অনুসারে তিনবার নির্বাচিত ও বর্তমান মেয়র মঞ্জুরুল ইসলাম বিমলকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মনোনয়ন পেয়েছেন নজরুল ইসলাম মোলাম। তিনি স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান পটলের সমর্থক। নাটোরের প্রতিটি স্থানেই সাবেক মন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে নাটোরে ছয়টি পৌরসভার মধ্যে পাঁচটির বিষয়ে তাঁর মতামত চাওয়া হলেও গোপালপুর বাদ রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাঁকে বলেন, সেখানে ফজলুল হক পটল সমর্থিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে খালেদা জিয়ার নির্দেশ রয়েছে। জানা গেছে, ওই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে পটলের পক্ষে তাঁর স্ত্রী ও সন্তান এসে তদবির করেছেন।
আবার সাভার পৌরসভার বর্তমান মেয়র রেফায়েত উল্লাহকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তিনি বর্তমানে জেলে। প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁর কাছে কাগজপত্র পাঠানোও হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি নির্বাচন করতে চাননি। ফলে বাধ্য হয়ে খালেদা জিয়া তৃণমূলের পাঠানো তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বদিউজ্জামানকে মনোনীত করেছেন।
জোটের শরিকদের জন্য ১৫টির বেশি ছাড় দিচ্ছে না বিএনপি। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের জন্য ১০-১২টি পৌরসভা ছেড়ে দেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক নেতার ভাষ্য, জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন খালেদা জিয়া নিজেই। তাই এখনই বলা যাচ্ছে না কোনগুলো তাদের দেওয়া হচ্ছে। তাদের যেগুলো দেওয়া হবে সেসবে বিএনপি প্রার্থীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের মনোনয়ন ঠিক হলে ওই পৌরসভাগুলো থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্তরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবে।
বিএনপিকে জামায়াত জানিয়েছে, পুলিশের ভয়ে তৃণমূলে তারা কোনো বৈঠক করতে পারছে না। ফলে কাকে সমর্থন দেওয়া হবে তা চূড়ান্ত করা যায়নি। এ ছাড়া ২০ দলীয় শরিকদের মধ্যে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) একটি (কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) একটি (চট্টগ্রামের চন্দনাইশ) আসন ছাড় দিয়েছে বিএনপি। জাপা ধানের শীষে নির্বাচন করবে, কিন্তু এলডিপি নির্বাচন করবে তাদের দলীয় ছাতা প্রতীকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 12 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ