কমিটি আছে নেতা নেই ঢাকা মহানগর বিএনপির

প্রকাশিত: 5:42 AM, February 1, 2016

কমিটি আছে নেতা নেই ঢাকা মহানগর বিএনপির

দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন ঢাকা মহানগর বিএনপি। অর্ধশত নেতার সমন্বয়ে আছে আহ্বায়ক কমিটি। ছয় সদস্যের উপদেষ্টা কমিটিও আছে। নেই শুধু শীর্ষ নেতারা। আহ্বায়ক কারাগারে। সদস্য সচিব আত্মগোপনে। মাঝারি ও নিচের দিকে কিছু নেতার দেখা মিলে হঠাৎ হঠাৎ। মহানগর কার্যালয়টিও প্রায় বন্ধই থাকে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে চরম ব্যর্থতার পর স্থবির হয়ে আছে সংগঠনটির পুনর্গঠন কার্যক্রমও। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমশ বাড়ছে।

গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে মহানগরের আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস, সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ প্রায় সব নেতাই চলে যান আত্মগোপনে। ৬ জানুয়ারি আব্বাস নিু আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে না থাকায় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মহানগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আবুল বাশার, আবু সাঈদ খান খোকনসহ কয়েকজন তাদের সহযোগিতা করছেন। তবে পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারা করতে পারছেন না।

জানতে চাইলে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, মহানগর আহ্বায়ক কারাগারে, সদস্য সচিবের সঙ্গে কারও যোগাযোগ নেই- এমন পরিস্থিতিতে পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। কমিটির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে আসার আগ পর্যন্ত এসব কাজে হাত দেয়াও সম্ভব নয়। কেন্দ্র থেকে আমাদের কাছে এমন কোনো নির্দেশনা নেই।

নেতারা নেই প্রকাশ্যে : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতার অভিযোগে ভেঙে দেয়া হয় ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি। সাদেক হোসেন খোকাকে সরিয়ে মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক ও হাবিব উন নবী খান সোহেলকে সদস্য সচিব করে ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই ৫২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। একই সঙ্গে ছয় সিনিয়র নেতাকে দিয়ে করা হয় একটি উপদেষ্টা কমিটিও। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিশ্বাস ছিল এবার ঢাকা মহানগরীতে আন্দোলন চাঙ্গা হবে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী শুরু হয় টানা অবরোধ। আন্দোলন শুরুর পরপরই আত্মগোপনে চলে যান মির্জা আব্বাস। গত এপ্রিলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে আসেন তিনি। আদালত থেকে জামিন নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হলেও গ্রেফতারের ভয়ে নামেননি গণসংযোগে। নির্বাচনের পরও জনসম্মুখে আসেননি তিনি। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গত ৬ জানুয়ারি জামিনের জন্য নিম্ন আদালতে হাজির হন আব্বাস। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার সময় সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা যায়নি।

সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে রয়েছে শতাধিক মামলা। গ্রেফতার এড়াতে এখনও তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিগত আন্দোলনে কয়েকদিন তাকে রাজপথে দেখা যায়। কিন্তু ৩ অক্টোবর রংপুরে এক বিদেশী হত্যায় তার ইন্ধনের অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। চার সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির মধ্যে শুরু থেকেই মহানগর কার্যক্রমের সঙ্গে দেখা যায়নি আসম হান্নান শাহকে। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া রয়েছেন আত্মগোপনে। সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন। আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে আছেন। দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা যাচ্ছে না। ছয় যুগ্ম আহ্বায়কের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু আন্দোলনের সময় আত্মগোপনে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন। গ্রেফতার এড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই আত্মগোপনে আছেন সাবেক কমিশনার এমএ কাইয়ুম। কয়েক মাস আগে গুলশানে এক ইতালি নাগরিক হত্যায় তার ইন্ধনের অভিযোগ ওঠে। ওই হত্যার অভিযোগে তার ভাইকে গ্রেফতারও করা হয়। ইতালি নাগরিক হত্যার আগ থেকে কাইয়ুম মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। গোপনে মাঝে মধ্যে দেশে আসতেন। কিন্তু ইতালি নাগরিক হত্যার পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ কমিটি ঘোষণার পর প্রথমে কিছুদিন সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু পুনর্গঠন ইস্যুতে তার সঙ্গে মহানগরের কয়েক নেতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর থেকে পর্দার আড়ালে চলে যান তিনি। মহানগর এমনকি কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচিতেও তাকে দেখা যাচ্ছে না। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আবুল বাসার ও আবু সাঈদ খান খোকন প্রকাশ্যে থেকে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু নীতিনির্ধারণী কোনো কাজে তাদের দেখা যাচ্ছে না।

কমিটির অন্যতম সদস্য আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু আন্দোলনের পর থেকে প্রকাশ্যে নেই। কেন্দ্রীয় পদ রক্ষায় আমান সম্প্রতি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউনুস মৃধা, বজলুল বাসিত আঞ্জু, আলী আজগর মাতব্বর, আরিফুর রহমান নাদিমসহ আরও কয়েকজনকে মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও বাকি সদস্যরা আছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।

পুনর্গঠনে ব্যর্থ : পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য দুই মাসের সময় বেঁধে দেয়া হয় আব্বাস-সোহেলকে। মহানগরীর ৪৯টি থানা ও ১০০টি ওয়ার্ড এবং বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ১৫টি টিম গঠন করা হয়। ওইসব টিম প্রায় সব ওয়ার্ড কমিটি চূড়ান্ত করে। এরপর কয়েকটি থানা কমিটি পুনর্গঠনের পরই থমকে যায় সবকিছু। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পুনর্গঠনের কাজ শেষ হয়নি। সহসাই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তবে মহানগর বিএনপির একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর প্রায় সব ওয়ার্ড ও অধিকাংশ থানা কমিটি গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তা ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান খোকন যুগান্তরকে বলেন, মহানগরের কার্যক্রম শুধু ঝিমিয়ে পড়েনি, কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ পর্যন্ত নেই। বিগত আন্দোলনে ব্যর্থতার পর পরবর্তী করণীয় নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। আন্দোলনের পূর্বে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কোনো অগ্রগতি নেই।

তিনি বলেন, মহানগর কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মামলাসহ নানা কারণে প্রকাশ্যে আসছেন না। আহ্বায়ক কারাগারে। কীভাবে কার্যক্রম চলবে বুঝতে পারছি না। এই ব্যাপারে দলের হাইকমান্ডের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন বলে মনে করেন মহানগরের এই নেতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 23 বার পঠিত হয়েছে