রূপোলী পর্দার গৈরিকিকরণ – বিষবৃক্ষের চারা আজ মহীরুহ

প্রকাশিত: 11:48 AM, September 26, 2015

KMAশুরুটা আজ হয় নি, খুব ধীরে ধীরেই শুরু হয়েছিল এবং এগিয়েছে খুব পরিকল্পনামাফিক। পুনেতে ফিল্ম আন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান পদে গজেন্দ্র চৌহানের মতো এক চতুর্থ শ্রেণীর অভিনেতা তথা সংঘ পরিবারের অনুগত একজনকে বসানো আসলে বৃত্ত সম্পূর্ণ করার চেষ্টা মাত্র। রূপোলী পর্দার হিন্দুত্বকরণের চেষ্টা। এটি আসলে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার চেষ্টা, যার উদ্দ্যোগ শুরু হয়েছিল গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকেই। যদিও তার আগেও হিন্দি সিনেমায় হিন্দুত্ববাদের সুড়সুড়ি ছিলই। ছিল দেশাত্মবোধক ফিল্মগুলির মধ্যে দিয়ে। কিন্তু বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক ফ্রন্ট বিজেপি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বাড়াতে শুরু করার পর থেকেই সর্বগ্রাসী চরিত্র নিয়ে হিন্দি সিনেমায় হিন্দুত্ববাদের পরিকল্পনামাফিক যাত্রা শুরু মোটামুটি ১৯৯৪–৯৫ সাল থেকে। তখনো তা ছিল বিষবৃক্ষের চারা, আজ যা বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিখ্যাত বটগাছের মতোই বৃহৎ হয়ে উঠেছে।
আইপিটিএ–র প্রভাবে ১৯৬০–এর হিন্দি সিনেমা ছিল বাম দিকে হেলে থাকা, মূলত রাজকাপুরের ফিল্মগুলি। ১৯৭০–৮০–এর অমিতাভ বচ্চনের ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’ ইমেজের ফিল্মগুলিতেও প্রধান চরিত্র আসতো শ্রমজীবী পরিবার থেকে। ১৯৯০–এর মাঝামাঝি থেকে পুরো উল্টো মেরুতে ছুটলো হিন্দি সিনেমা। যার শুরু হলো ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ ফিল্মটি থেকে। যে ফিল্মে একটিও শ্রমজীবী চরিত্র নেই, পুরো ফিল্মটিই ঘোরাফেরা করে উচ্চবিত্ত, নয়তো উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃত্তে। আরো লক্ষণীয় যে, ফিল্মটিতে কোনো নিম্নবর্ণ হিন্দু চরিত্রও নেই। হিন্দু ব্রাক্ষণ্যবাদের অন স্ক্রিন আগ্রাসন শুরু হলো। এই ফিল্মটিতেই হিন্দু সংস্কৃতি ও আচার আচরণের ঢালাও প্রদর্শন এবং তার ওপর মহিমা আরোপ করা শুরু। এবং এমনভাবেই তা শুরু, যেন সেগুলিকে বাদ দিয়ে জীবন চালানো হয় সম্ভব নয়, নয়তো চালানোটা অপরাধ। এর পর থেকে বাণিজ্য সফল হিন্দি ফিল্ম (যাকে চলতি ভাষায় ‘হিট’ ফিল্ম বলা হয়) মানেই হয়ে দাঁড়ায় হিন্দুত্ববাদের প্রচার, তা সে প্রেমকাহিনী, পারিবারিক গল্পের মোড়কেই আসুক বা দেশাত্মবোধক ফিল্মের নামে।KMA
‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’, ‘মোহব্বতে’র মতো ফিল্মগুলিও সেই পথেই হেঁটেছে। ‘হাম দিল দে চুকে সনম’, ‘পরদেশ’, ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ এর ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম হয় নি। বরং ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’–এর দেখানো পথকে আরো বেশি করে ও আরো সফলতার সাথে ব্যবহার করেছে হিন্দুত্ববাদীরা পরের ফিল্মগুলিতে তাদের মতাদর্শ প্রচার করার ক্ষেত্রে। কারণ ভারতীয়ত্বের ধারণার সাথে হিন্দুত্বের ধারণাকে মিলিয়ে দেখানোর এক সুক্ষ্ম কিন্তু সফল কৌশল দর্শকদের সামনে নিয়ে আসা হয় এবার। মনে পড়ে ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’ ফিল্মটির সেই কলেজ র‍্যাগিং দৃশ্য যেখানে বিদেশ থেকে দেশে ফেরা রানী মুখার্জির লিপে ‘ওম জয় জগদিশ হরে’ ভজন? এবং তার পরে বলা ডায়লগ যে, বিদেশে থাকলেও সে নিজের দেশের সংস্কৃতি ভোলেনি। লক্ষ্য করুন, দেশের সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতিকে কিভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং সিনেমা হল ভক্তিরস ও দেশপ্রেমে ভেসে গিয়ে হাততালিতে উপচে পড়েছে। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘পরদেশ’ এই কাজটাকেই ফিল্মে ‘ইউনিক সেলিং পয়েন্ট’ করে তুলে বক্স অফিসের ‘বুলস আই’ ফুঁড়ে দিয়েছিল। অবশ্য ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ এখানেই থেমে না থেকে খাপ পঞ্চায়েত ও ‘অনার কিলিং’এর মহত্ব প্রচারও করে গেছিল সেই ১৯৯৫ সালেই।
১৯৯০–এ হিন্দি সিনেমার প্রধান দুটি ধারা ছিলো, একটি ছিল প্রেমকাহিনী ও পারিবারিক ফিল্মের ধারা, আরেকটি ছিল দেশাত্মবোধক অ্যাকশনভিত্তিক ধারা। দ্বিতীয় ধারাটি সরাসরি পাকিস্থান ও অহিন্দু–নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং আদিবাসীদের শত্রু হিসেবে ঘোষনা করছিল। যেমন ‘গদর, এক প্রেম কথা’, ‘সরফরোশ’, ‘বর্ডার’, ‘এলওসি কারগিল’, ‘রিফিউজি’। ফিল্মের চরিত্রগুলি থেকে হয় অহিন্দু–নিম্নবর্ণের হিন্দু–আদিবাসী চরিত্র হারিয়ে গেছিল বা তাঁরা খারাপ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হতে শুরু করে। ধীরে ধীর ফিল্ম এই সময় হিন্দুত্ববাদকে মতাদর্শগতভাবে আক্রমণ করার সাহস দেখিয়েছিল। ‘ফায়ার’ ও ‘ওয়াটার’। সেন্সর বোর্ডের বারবার বাধাদান থেকে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের আক্রমণ যে কি পরিমাণে সামলাতে হয়েছিল এই দুটি ফিল্মকে তার বিবরণ দিতে গেলে আরো একটি আলাদা লেখা লিখতে হবে। আসলে এই সবই ছিল হিন্দি সিনেমায় হিন্দুত্বের রথ এগিয়ে চলার প্রমাণ। ২০০০ সালে এসেও এই প্রবণতা বিন্দুমাত্র কমেনি। বারবারই বড় ব্যানার, বড় বাজেট, বড় স্টারদের নিয়ে তৈরি ফিল্মগুলি হয় হিন্দু সংস্কৃতি তথা হিন্দুত্ববাদের জয়গান গেয়েছে, নয়তো হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বকে মিলিয়ে দেখানোর সংঘ পরিবারের রাজনীতিকেই অনুসরণ করে চলেছে। সংঘ পরিবারের রাজনীতি একদিকে যেমন হিন্দুত্ববাদী, অন্যদিকে তেমনই সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজির দালালির রাজনীতি। ২০০০ সালের হিন্দি সিনেমা সবদিক দিয়েই সেই পথেরও সেবা করেছে। এই সময়ই হিন্দি সিনেমা এক ঝাঁ চকচকে ভারতের স্বপ্ন ফেরী করতে থাকে। বলাই বাহুল্য যে সেই স্বপ্ন আসলে অলীক স্বপ্ন মাত্র। কিন্তু আজকের ‘স্মার্ট সিটি’, ‘সবকা বিকাশ সবকে সাথ’, ‘আচ্ছে দিন’–এর গপ্পো শোনানো মোদীজীর কষ্ট কল্পিত ভারতের সাথে সিনেমার সেই ভারতের অদ্ভুত মিল।
zoniহিন্দুত্ববাদ যে আসলে ফ্যাসিবাদ সেটা আমরা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছি আজ। তার সাথে এটাও বুঝতে শুরু করেছি যে, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিত্তি তৈরি করার কাজটা কতদিন ধরে, কত ধৈর্য্য ধরে করেছে সংঘ পরিবার। আমরা যারা ফ্যাসিবাদী শাসনকে প্রতিরোধ করতে চাই তারা সেই তুলনায় কোনো প্রস্তুতিই নিই নি বলা চলে। বলা ভালো পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের কোনো বোঝাপড়াই ছিলো না, প্রস্তুতি তো দূরের বিষয়। ফলে অনেক পিছিয়ে থেকেই আজ আমাদের শুরু করতে হচ্ছে এবং খুব তাড়াতাড়ি আমরা ভালো কিছু আশা করতেও পারিনা তাই। হিন্দি সিনেমার হিন্দুত্বকরণ নিয়ে এই সামান্য পর্যালোচনা থেকেই আমরা দেখতে পাই হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের প্রচারযন্ত্র হয়ে ওঠার সাথে সাথেই হিন্দি সিনেমা উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। যা আগে শ্রমজীবী জনতার থেকেই প্রধান চরিত্রদের তুলে আনতো। ফলে বোঝাই যায় হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ বা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের সাথে সখ্যতা উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীরই। আর কোনো সখ্যতাই নেই শ্রমজীবীর। ফলে শ্রেণী সংগ্রামেই প্রতিরোধ করতে হবে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদকে। লেখাটা শুরু করেছিলাম ফিল্ম আন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান পদে সংঘ পরিবার অনুগত গজেন্দ্র চৌহানকে বসানোর মাধ্যমে হিন্দি সিনেমার হিন্দুত্বকরণের বৃত্ত সম্পূর্ণ করার চেষ্টার কথা বলে। সেই বৃত্ত কিন্তু আজো সম্পূর্ণ হয় নি। এই লেখা লেখার সময় আমরণ অনশনে বসেছেন ফিল্ম আন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার অধ্যাপক ও ছাত্ররা গজেন্দ্র চৌহানসহ সমস্ত সংঘ পরিবার অনুগতদের নিয়োগ রুখতে। ১০০ দিনে পড়তে চলেছে তাঁদের ধর্মঘট। সারা দেশে সমর্থনের ঝড় না হলেও হাওয়া বইছে। বৃত্ত সম্পূর্ণ এখনো হয়নি। না হতে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 29 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ