আজ শওকত আকবরের মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশিত: 8:24 AM, June 23, 2015

আজ শওকত আকবরের মৃত্যুবার্ষিকী

zoniপ্রান্ত ডেস্ক:বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসের এক স্মরণীয় নাম শওকত আকবর। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের প্রায় শুরু থেকে যে কয়জন ব্যক্তি এর উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেছেন তার মধ্যে একজন এ কিংবদন্তি অভিনেতা। তার পুরো নাম সাইদ আকবর হোসেন। আজ এ অভিনেতার ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০০ সালের ২৩ জুন লন্ডনে ৬৩ বছর বয়সে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন শওকত আকবর।
শওকত আকবরের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৭ মার্চ। তার শৈশব কাল কেটেছে কলকাতার হুগলীতে। স্কুলজীবনে তিনি হুগলি স্কুলে পড়াশোনা করেন। তার পিতা ছিলেন হুগলির ইসলামিক কলেজের প্রভাষক। স্কুলজীবন থেকেই সিনেমা দেখার পর অভিনয়ের প্রতি অনেকটা আসক্তি হয়ে পরেন। স্কুলজীবনেই তিনি মঞ্চে অভিনয় শুরু করে দেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি প্রথম দেবদাস নাটকে অভিনয় করেন। সে সময় তিনি হুগলিতেই ছিলেন। এরপর ১৯৫০ সালে বর্ধমান জেলায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ববাংলার ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন শওকত আকবর। পরের বছরই তিনি মেডিকেল কলেজে এলএমএফ কোর্সে ভর্তি হন। চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়ালেখা করার পরও অভিনয়কেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। হয়েছেন বাংলা চলচিত্রের একজন প্রতিতজশা অভিনেতা।
১৯৬৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে আড়াইশ সিনেমাতে অভিনয় করেন শওকত আকবর । ১৯৫৭ সালের দিকে এ অভিনেতা মেডিকেল কোর্স শেষ না করেই শৌখিন শিল্পী হিসেবে নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। শৌখিন শিল্পী হিসেবে জীবনে প্রথম অভিনয়ের হাতে খড়ি হয় ভারতের প্রখ্যাত বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘তাইত’ নাটকে। এ নাটকে শওকত আকবর সহনায়কের চরিত্রে ছিলেন। শওকত আকবর অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘এইতো জীবন’। সিনেমাটি ১৯৬৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল। তবে এইতো জীবন সিনেমাটি মুক্তির আগেই ১৯৬৩ সালে তার অভিনীত—‘তালাশ’ এবং ‘পয়েসে’ সিনেমা দুটি মুক্তি পায়।
এরপর একে একে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে কয়েকটি হলো—আগুন নিয়ে খেলা, ভাইয়া, আখেরি স্টেশন, জংলী ফুল, ওয়েটিংরুম, দিল এক শিশা, বেরহম, হামদাম, অপরিচিতা, অভিশাপ, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, শরীফে হায়াত, সাতরং, গৌরী, জীবন থেকে নেয়া, বড় বৌ, টাকা আনা পাই, মোমের আলো, চলো মান গায়ে, আলোর পিপাসা, নতুন সুর, মেঘ ভাঙা রোদ, জানাজানি, আপন দুলাল, ইশারা, অবুঝ মন, ফকির মজনু শাহ প্রভৃতি।
ফকির মজনু শাহ সিনেমাতে শওকত আকবর ভবানী ঠাকুরের চরিত্রে অবিস্মরণীয় অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ের প্রথমদিকে তার অভিনীত উর্দু সিনেমা তালাশ, আখেরি স্টেশন এবং ভাইয়া তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তি হওয়ার কারণে লাহোর, করাচী, মুলতান, পেশোয়ার, মারী, গুজরানওয়ালা, কোয়েটা, শিয়ালকোট, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, গিলগিট প্রভৃতি শহরেও তার নাম সিনেমা প্রেমিকদের মুখে মুখে ছিল।
শওকত আকবরের চেহারা নায়কসুলভ থাকা সত্ত্বেও ঢাকার চিত্র পরিচালকরা তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করেননি। তিনি হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমার নায়ক ছিলেন ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে। সেসব সিনেমা হলো—দিল এক শিশা, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, পুণম কী রাত, জুগনু, আওর গম নেহি, এইতো জীবন প্রভৃতি। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তিনি সুমিতা দেবী, রোজী, শর্মিলী, রেশমা প্রমুখের বিপরীতেই বেশি ছিলেন। লাহোরে গিয়ে তিনি সোফিয়া রানু, রোজিনা, রুখসানা, শামীম আরা, বাহার প্রমুখ নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন।
শওকত আকবর মঞ্চে নাটক করাকালীন তার সঙ্গে মঞ্চ অভিনেত্রী মুক্তার সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর দুজনের মধ্যে মন দেয়া-নেয়া হলো। অবশেষে ১৯৬১ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬২ সালে তাদের প্রথম ছেলে ভূমিষ্ঠ হলো। সেই ছেলের নাম মিল্টন আকবর। মিলটন আকবর হলেন বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের স্বর্ণালি সময়ের প্রথম সারির ড্রামার যিনি এলআরবি ও মাইলসে দীর্ঘদিন বাজিয়েছিলেন। তিনি লন্ডনের নামকরা ড্রামবাদক ছিলেন।
শওকত আকবর তার অভিনয় জীবনে ভিখারি থেকে রাজা বাদশা, নিম্নবিত্ত শ্রমিক থেকে অহংকারী শিল্পপতি, যুবক থেকে বৃদ্ধ সহ এমন কোন চরিত্র নেই যে অভিনয় করেননি। সব চরিত্রেই দারুন ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতেন শওকত আকবর। কোনদিন কোন চরিত্রে শওকত আকবরের অভিনয় দেখে দর্শকদের মনে হয়নি ঐ চরিত্রের জন্য তিনি উপযুক্ত ছিলেন না। শওকত আকবর মুলত নায়ক এবং সহ অভিনেতা দুটো চরিত্রেই অভিনয় করে থাকলেও সহ অভিনেতা হিসেবে বেশি পরিচিত। এছাড়া তিনি বহু সিনেমাতে রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম সহ-অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমাতে রাজার চরিত্রে অভিনয় এখনো মানুষের মনে দাগ কেটে আছে।
টাকা আনা পাই সিনেমাতে তিনি নায়ক রাজ রাজ্জাকের পিতার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন। সেই সিনেমাতে তিনি ছিলেন একজন অন্ধ বাবুর্চি যে তার ছেলেকে অনেক কষ্ট করে শিক্ষিত করে তোলেন । ছেলে বড় হয়ে চায় না তার বাবা বুড়ো বয়সে বাবুর্চির কাজ করুক তাই সে পিতার অমতে শহরের ধনাঢ্য পিতার একমাত্র কন্যাকে বিয়ে করেন কিছু শর্তে যা দিয়ে তিনি পিতার বন্ধক রাখা জমি ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এই নিয়ে চলে পিতা ও পুত্রের মান অভিমান, টানা পোড়েন। সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শওকত আকবর দুর্দান্ত অভিনয় করেন ।দারাশিকো পরিচালিত ফকির মজনু শাহ সিনেমাতে ভবানী ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করেন, জাতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ সিনেমার পদক পাওয়া পদ্মা মেঘনা যমুনা সিনেমাতে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য।
বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান স্বরূপ শওকত আকবর জাতীয় চলচ্চিত্র আজীবন সম্মাননা পুরস্কার এবং মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা লাভ করেছেন। অভিনয় পাগল এই মানুষটি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অভিমান করেই অভিনয় জীবন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। অনেকটা অভিমান করেই ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে লন্ডনে ছেলে মিলটন আকবরের কাছে চলে যান এবং সেখানেই ২০০০ সালের ২৩ শে জুন মৃত্যুবরণ করেন। লন্ডনের মুসলিম কবরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।
শওকত আকবরের মতো গুণী অভিনয় শিল্পীর সঠিক মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য তিনি যা করেছেন প্রতিদানে আমরা তাকে কিছুই দিতে পারিনি। গুণী এ অভিনেতার নাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রেমীদের হৃদয়ে চিরদিন লেখা থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংবাদটি 16 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ